“সমুদ্র সৈকত আর ক্যাসিনো ছাড়াও কিন্তু অনেক কিছু আছে গোয়াতে!", গোয়ায় কিছুদিন কাটানোর পর এক স্থানীয় বাসিন্দার থেকে হঠাৎ এহেন জ্ঞানলাভের সৌভাগ্য ঘটে গেল আমার। পরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম যে কথাটা সিকিভাগও মিথ্যে নয়। “লাফ দিয়ে একখান বাসে চড়ে বসো আর বেরিয়ে পড়ো!”, ভদ্রলোকের আমুদে পরামর্শে কৌতূহলটা উশকেও উঠল মোক্ষম রকম।
সেই কৌতূহলের ঠেলা সামলায় কে! অতএব স্যাঁতসেঁতে এক রবিবার সমুদ্র সৈকত পেছনে ফেলে ধেয়ে চললাম গোয়ার ভেতর বাগে এক তালুকে। হিন্দু মন্দির আর রকমারি মশলার খামারের জন্য সে জায়গার নামডাক। আরও একগুচ্ছ মশলা বাগানের মধ্যে থেকে আমার মনে ধরল, পন্ডা থেকে আন্দাজ ২কিমি দূরে, কুর্তির সহকারী স্পাইস ফার্মকে। অন্যান্য মশলা খামারের মতোই এখানে কয়েকশো একর জমির উপর চাষ হয় বিভিন্ন মশলা, ফল, ঔষধি গাছ-গাছড়া। স্থানীয় ভাষায় কুলাগর বলে পরিচিত একরকম মিশ্র চাষের পদ্ধতির সুবাদে গড়ে ওঠে এই খামারগুলো। নতুন শতাব্দীতে এসে এরা আবার 'পরিবেশ-পর্যটন' ক্ষেত্র হিসেবে মেলে ধরছে নিজেদের।
মশলায় মাতোয়ারা বাগিচা
সাবেক রীতিরেওয়াজ মতো জুঁই আর গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনার পালা সাঙ্গ হলে পর, সেদিনের জন্য আমার গাইড সিরিল নারকেলের জল আর এক বাটি টাটকা কাজু-বাদাম ধরিয়ে দিলেন আমায়। এরপরেই দুপুরে বুফেতে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে জানিয়ে এখন হালকা পেটে খাওয়ার পরামর্শ দিতেও ভুললেন না। পাশের ছাউনিতে ততক্ষণে দলে দলে এসে পৌঁছেছেন বিদেশী পর্যটকেরা। দুপুরবেলা সামনে থরে থরে সাজানো খাবারদাবারের ওপর হামলা করার আগে অবিশ্যি কুশলবিনিময় হল পাশের টেবিলের এমন একজনের সঙ্গে, যাঁর দর্শন এখানে পাব মোটেই ভাবিনি। ভদ্রলোক গোয়ার মাদক-বিরোধী সেলের এস-পি, আগেরদিনই উত্তেজনায় ভরপুর এক সাংবাদিক বৈঠকে মোলাকাত হয়েছিল তাঁর সঙ্গে।
গাছের পাতার চাঁদোয়ার তলায়, কাঠের বেঞ্চে বসে গোয়ার ঐতিহ্যবাহী রান্না আস্বাদন করতে অন্তত একটা গোটা ঘণ্টা তো লেগেই যায়। সুপুরি পাতার থালা, বাঁশের চামচ আর মাটির ভাঁড়ে প্রত্যেকটা মুহূর্ত ভরিয়ে রাখে সে সোয়াদের জাদু। রান্নায় ব্যবহার হয়েছে চাষের হলুদ, ধনে, দারচিনি আর গোলমরিচ - এগুলোই গোয়ার খাবারে ব্যবহৃত মূল মশলা। কব্জি ডুবিয়ে খেয়েছিলাম চিংড়ি ভাজা, চিংড়ি কারি, রাভা কিং ফিশ বা সুজি দিয়ে ভাজা সুরমাই মাছ, আর চিকেন শাগুতী – মূলত পর্তুগিজ খানা হলেও হিন্দু মতে ভিনিগার ছাড়াই রান্না করা হয়েছিল সেটা। আর ছিল সম্প্রতি আমার পছন্দের তালিকায় ঠাঁই পাওয়া দুই খাদ্য: শুকনো শেলফিশ [শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া জাতীয় শক্ত খোলাযুক্ত প্রাণী] পঞ্জিমের সাধারণ খাবারের থালিতেই যা খেয়েছিলাম আগে কিন্তু এখানে সেটা আকারে বৃহৎ আর পরিপুষ্ট ,তার সঙ্গে ভাজা চোনাক বা লাল কোরাল মাছ ভাজা। শেষে গলা ভেজানো হল কোকুমের শরবতে আর মুখমিষ্টির খাতিরে ভ্যানিলা আইস-ক্রিম আর তাজা ফল তো ছিলই।
এন্তার খাওয়াদাওয়ার পরেও কিন্তু গোয়ার প্রখ্যাত “সুসেগাদ” বা ঝিমঝিমে আয়েসখানা গেড়ে বসবে না। ভাগ্যিস! পরের দু'ঘণ্টায় যে দীর্ঘ একখানা খামার সফর রয়েছে। আর তারই শুভারম্ভ করতে সিরিল কিনা আমার দিকে নিশ্চিন্তে একটা বড়ো ফেনি শট এগিয়ে দিলেন!
আমাদের মৃদুমন্দ সফরে আর কিছু দূর এগিয়ে, পাতায় ঢাকা ছোট্ট সাঁকোটা দুলকি চালে পেরিয়ে আসার পর, এক গুচ্ছ ছোটো পাতা আমার নাকের সামনে ঠেসে ধরলেন সিরিল। ফেনির মৌতাত তখনও কাটেনি। "কী জানি, ঠাহর করতে পারছি না," হার মানতে হল। “বে লিফ বা তেজ পাতা,” জবাবটা দিয়েই একটা ডাল ভেঙে উজ্জ্বল হলুদ দেখাতে লাগলেন আমাদের। তারপর একে একে দেখা হল মরিচ, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, জায়ফল। টক টক জাম চালান করা গেল মুখে, কচি আনারস দেখলাম নেড়েচেড়ে, উঁচু কাঁঠাল গাছের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইলাম খানিক। প্রত্যেকটা গাছের বৈশিষ্ট্য বলে তাদের ঔষধি গুণেরও ব্যাখ্যান দিচ্ছিলেন সিরিল। এভাবেই রান্নাঘরের সাদামাটা নিরীহ মসলার বাক্সটা যেন জলজ্যান্ত হয়ে উঠছিল চোখের সামনে। ভারতের অল্প যে কয়েকটা খামারে ভ্যানিলা উৎপাদন হয় তার মধ্যে এটা অন্যতম।
এ সফরের আরেকটার ভালো দিক এই যে অনর্গল বক্তৃতার হুজ্জুতি নেই এতে। “তবু, রোজ রোজ একই কথা বলে যেতে ক্লান্ত লাগে না?” জিজ্ঞেস করে বসি। “এই যে এত কিসিমের লোকের সঙ্গে দেখা হয় রোজ, ওতেই বেশ রকমফের ঘটে আমাদের জন্য। পর্যটকদের থেকেও তো কত কিছু শেখা হয়ে যায়। সাধারণত বিদেশিদের কিছু জ্ঞানগম্যি থাকে; অনেক ভারতীয় তো রান্নায় নিজেরা কী মশলা দেয় তার নামটা পর্যন্ত জানে না!" হেসে ওঠেন আমাদের চশমাচোখো পরিদর্শক।গত দশ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন তিনি। কাজু, নারকেল আর সুপুরিবনের সবুজ গায়ে মাখতে মাখতে ভাবলাম, হায় রে কী দুর্দশা!
খামারের মধ্যে পাখি দেখার নির্দিষ্ট এলাকা আছে। এখানকার কর্তৃপক্ষর দাবি অনুযায়ী, ৮০ রকম প্রজাতির পাখি দেখা গেছে এখানে। হাতির পিঠে একটা ছোট্ট সফরের জন্য খানিক দাঁড়ানো হল। এখানে তিন সদস্যের হাতি পরিবারকে খাওয়ানো কিংবা চান করানো যায়, বদলে তারাও জল ছিটিয়ে দিলখুশ করে দেয়। সেদিনকার মতো হাতির পিঠে ঘোরাঘুরি করেই মন ভরালাম। তারপর ফের পায়ে হাঁটা। সিরিল এবার নিয়ে গেলেন তাঁদের ফেনি চোলাইয়ের জায়গায়। এখানে কাজু আপেল বা কাজুর প্রধান ফলটার রস এক সপ্তাহ গেঁজিয়ে নিয়ে চোলাই করতে হয়। প্রথম বার করার পর তৈরি হয় একটু হালকা মদ উড়াক, আর দ্বিতীয়বার চোলাইয়ের পর হাজির হন নামজাদা ফেনি মদ। প্রতি ১০ দিনে ৩০ লিটার ফেনি তৈরি করা যায় এই পদ্ধতিতে। ৭৫ জন লোক এ খামারে কাজ করেন। আমাদের বরাদ্দ দেড় ঘণ্টা এবার শেষের পথে। আমার পিঠ দিয়ে এক মগ বরফঠান্ডা ঔষধি জল ঢালা হতেই আঁতকে উঠলাম। জলটা ঢালতে ঢালতেই একগাল হাসলেন এক মহিলা, “চিন্তা করো না, এক্ষুনি শুকিয়ে যাবে।”
একটা কুঁড়েতে ক্লান্ত পায়ে এসে বসলে, ঠান্ডা ছায়ায় বসে চুমুক দেওয়ার জন্য এক কাপ লেমনগ্রাস চা এনে দিলেন সিরিল। এরপর বাড়ি ফেরার পালা। তবে যাওয়ার আগে ঝোলা ভরে চাষের জিনিস নিতে ভুললাম না। সঙ্গে আবার আবার একটা বিলিপত্রও পাওয়া গেল যাতে হরেক প্রাকৃতিক দাওয়াই বাতলানো – সে অবসাদই হোক, কী মধুমেহ কিংবা ওজন কমে যাওয়া…এমনকি পুরুষদের যৌন দৌর্বল্য 'সারানোর' তেলের কথাও বলা ছিল, যেখানে মেয়েদের জন্য অমন ওষুধপত্তর নাকি কামনা জাগিয়ে তুলতে কিংবা দেহের বাড়বৃদ্ধি ঘটাতে কাজে আসবে এমন দাবি করা হয়। ওসব ব্যবহারে "নেশা কিংবা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ভয় নাই," এমন আশ্বাসও দেওয়া ছিল।
একটা অভিজ্ঞতা হল বটে এই 'মশলা'-দার বাগানে, গড়গড়িয়ে ছুটতে থাকা বাসটায় বসে বসে ভাবছিলাম এসব আর ব্যাগের মধ্যে খুশবুতে ম ম ভ্যানিলা শুঁটিগুলোর গন্ধ নিচ্ছিলাম বুক ভরে।
হালহদিশ:
পৌঁছনোর জন্য: পঞ্জিম থেকে পন্ডা (৩০ কিমি) সরকারি বাস যায়। সেখানে নেমে অটো বা ট্যাক্সি ভাড়া করে মোটামুটি ২ কিমি দূরে কুর্তির মশলা খামারে পৌঁছনো যেতে পারে। অথবা পঞ্জিম থেকেই সরাসরি ট্যাক্সি পাওয়া যাবে।
খরচাপাতি: ৪০০+ টাকা পড়বে খাওয়াদাওয়া আর ফার্ম সফর মিলিয়ে।
সময়: সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত সারা বছর খোলা।
এই অঞ্চলের অন্যান্য মশলা খামার: সাভৈ প্ল্যানটেশন, আবিস স্পাইস ফার্ম, ট্রপিকাল স্পাইস প্ল্যানটেশন
এই প্রবন্ধটি সিএসই ফেলোশিপের অধীনে লেখা হয়েছিল। ২০১০ সালে সম্পাদিত সংস্করণে হিন্দুস্তান টাইমসে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল
অনুবাদ: দীপান্বিতা ভট্টাচার্য্য
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী



