“দ্যাখ, দ্যাখ! ওই চলল আজুবা বাইক, বাইক চালায় সবজির বস্তা!” হইহই করে ওঠে ছেলেপুলেরা। খেতের সবজিপাতি নিয়ে মোপেডে চড়ে শিবগঙ্গাই থেকে ১৫ কিমি দুরের মেলাকাড়ু গ্রামের বাজারে যাওয়ার সময়, হামেশাই এইসব চেঁচামেচি শুনতে পান চন্দ্রা। “আসলে হয়েছে কি, আমি যখন বাইকের সামনে আর পিছনে একদম বোঝাই করে সব্জির বস্তা নিয়ে যাই, ওরা চালক কে ঠাহর করতে পারে না," বুঝিয়ে বলেন তামিলনাড়ুর এই ক্ষুদ্র কৃষক।


Sivagangai, Tamil Nadu
|THU, APR 24, 2025
জাদু চাকায় সওয়ার দিলদরিয়া ছোট্ট চাষি
তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গাই জেলায় একক মা চন্দ্রা সুব্রমনিয়ান একা হাতেই সামলান চাষবাস আর খুচরো বিক্রিবাটার যাবতীয় ঝক্কি
Author
Translator
নিজের জাদু মোপেডের একেবারে পাশটিতে, ঘরের উঠোনে একটা পাটের খাটিয়ায় আসীন চন্দ্রা সুব্রমনিয়ানকে দেখলে বাস্তবিকই ছোট্টখাট্ট বলে মনে হয়। রোগাপাতলা গড়ন, লোকে ভাববে বছর আঠেরো বয়স বুঝি। আসলে কিন্তু ২৮ বছরের চন্দ্রা দুই সন্তানের মা আর ভারি উদ্যমী এক কৃষক, স্বামীহারা হয়েছেন বলে তাই নিয়ে বয়স্ক মহিলাদের আগ-বাড়ানো দরদ একেবারে অসহ্য ঠেকে তাঁর কাছে। “আমার কী হবে না হবে তাই নিয়েই সবার মাথাব্যথা, এমন কি আমার মা’র পর্যন্ত। হ্যাঁ, আমার যখন ২৪ বছর বয়স তখন আমার বর মারা গিয়েছে, কিন্তু আমি তো এই অতীতকে ফেলে এগিয়ে যেতে চাই। তাই বারবার ওদের বলেছি অযথা আমার মনখারাপ না করতে।”
তবে চন্দ্রার সঙ্গে থাকলে মনখারাপ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অক্লেশে হাসিঠাট্টা করেন তিনি, বিশেষত নিজেকে নিয়ে। স্বভাবসিদ্ধ আমুদে মেজাজে তাঁর অভাব-অনটনে ভরা বাল্যস্মৃতিও ফুরফুরে করে তোলেন নিমেষে, "একবার রাতবিরেতে বাবা আমাদের ঘুম থেকে তুলে দিল। আমার বয়স দশ-ও হয়নি তখন। বলল, বাইরে পূর্ণিমার সাদা চাঁদের আলোয় চাদ্দিক ধুয়ে যাচ্ছে, এইবেলা অনেকটা ধান কেটে নেওয়া যাবে। প্রায় ভোর হতে চলল ভেবে আমি, দাদা আর বোন মিলে বাবা-মার সঙ্গে খেতে চললাম। সবাই মিলে সবটুকু ধান কাটতে প্রায় ৪ ঘণ্টা লেগে গেল। তারপর বাবা বলে কিনা, স্কুল যাওয়ার আগে আমরা এখনও খানিকটা ঘুমিয়ে নিতে পারি। তখন সবে রাত তিনটে! ভাবতে পারেন? ভদ্রলোক আমাদের রাত্তির ১১টায় ধানখেতে টেনে নিয়ে গেছিলেন!”

Aparna Karthikeyan
চন্দ্রা অবশ্য নিজের সন্তানদের সঙ্গে কোনও দিন এমনটি করবেন না। একক মা চন্দ্রা নিজের ৮ বছরের ছেলে ধনুশ কুমার এবং ৫ বছরের মেয়ে ইনিয়াকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো করে তুলতে বদ্ধপরিকর। কাছেই একটা ইংরিজি-মাধ্যম বেসরকারি স্কুলে পড়ে দু' ভাইবোন। এবং ওদের মুখ চেয়েই চন্দ্রা কৃষক হবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন।
“১৬ বছর বয়সে এক তুতোদাদার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আমি আর আমার স্বামী সুব্রমনিয়ান তিরুপ্পুরে থাকতাম। ও একটা হোসিয়ারি কোম্পানিতে দর্জি ছিল। আমিও ওখানেই কাজ করতাম। চার বছর আগে আমার বাবা এক পথ-দুর্ঘটনায় মারা যান। সুব্রমনিয়ান একেবারে ভেঙে পড়ে। ৪০ দিন পরে ও গলায় দড়ি দেয়। আমার বাবা ওর কাছে সব ছিলেন, সব…”

Aparna Karthikeyan
নিজের গ্রামে ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন চন্দ্রা। আবার দর্জি হিসেবে কাজ করবেন নাকি পড়াশুনোটাই চালিয়ে যাবেন? দারুণ দোটানায় পড়েছিলেন। সেসময় দুটো কাজই সমান কঠিন হতো তাঁর জন্য, সেকথা নিজেই বুঝিয়ে বললেন। চাকরি মানেই বাচ্চাদের থেকে অনেকটা সময় আলাদা কাটানো। তাছাড়া ডিগ্রি পেয়ে ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য পড়াশুনো করতে গেলে তাঁকে আগে ১২ ক্লাসের পরীক্ষায় পাশ করতে হত। “গ্র্যাজুয়েট হওয়া অবধি কে আমার বাচ্চাদের দেখাশুনো করত? মা সবসময় আমার পাশে ছিল, কিন্তু তা হলেই বা…"
চন্দ্রার কাছে চাষবাস আসলে সময়ের বাঁধনছাড়া এক কাজ, নিজমুখে অবশ্য এসব আখ্যা দেননি তিনি। তবু বাড়ির খিড়কি জমিতে একটা নাইটি পড়ে কাজ করার এই সুবিধেটা তাঁর বড়ো পছন্দের। চন্দ্রার ৫৫-বছর বয়সি মা চিন্নাপন্নু আরুমুগাম স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের ১২ একর জমি তিন সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দেন। এখন মা-মেয়ে মিলে সবজি, ধান, আখ আর ভুট্টা ফলান। গত বছর চিন্নাপন্নু চন্দ্রার জন্য একটি বাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন। ছোট্টর মধ্যে বেশ পাকাপোক্ত বাড়িখানায় এখন খালি শৌচালয়টুকুরই অভাব। চন্দ্রা কথা দিয়েছেন, “ইনিয়া বড়ো হওয়ার আগেই একটা তৈরি করে ফেলব।”

Roy Benadict Naveen
এহেন সম্পদবৃদ্ধি বা মেরামতির খরচ আর সন্তানদের স্কুলের মাইনে আর জামা কেনার জন্য চন্দ্রা তাঁর বার্ষিক আখ চাষের উপর নির্ভর করে থাকেন। এছাড়া ধানের ত্রৈমাসিক আয় এবং অন্যান্য সবজি বেচে দৈনিক যে কয়েকশো টাকা হাতে আসে তা দিয়ে সংসার চলে যায়। এই চাহিদাটুকু মেটাতে দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন চন্দ্রা। ভোর চারটেয় উঠে বাড়ির কাজ, রান্নাবান্না সেরে বাচ্চাদের টিফিন গুছিয়ে দিয়ে দিন শুরু হয় তাঁর।
এরপর সোজা খেতে যান বেগুন, ঢ্যাঁড়শ আর লাউ তুলতে। তারপর ধনুশ আর ইনিয়াকে তৈরি করে পায়ে হেঁটে স্কুলে ছেড়ে আসেন তাদের। “স্কুলের কড়া নিয়ম যে বাবা মা নিজেরা ফিটফাট হয়ে বাচ্চাদের ছাড়তে আসবেন। তাই আমি নাইটির ওপর একটা শাড়ি জড়িয়ে চলে যাই,” মুচকি হাসেন চন্দ্রা। ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া অবধি খেতে কাজ চলে। “মাঝে হয়তো আধঘণ্টা মতো একটু জিরিয়ে নিই। খেতে তো সারাক্ষণই কাজ থাকে। সারাটা ক্ষণ!"

Roy Benadict Naveen
হাটের দিনে চন্দ্রা মোপেডে সবজির বস্তা বোঝাই করে শিবগঙ্গাই যান। “যখন ছোটো ছিলাম তখন একা একা কোথাও যেতাম না। ভীষণ ভয় করত। এখন তো দিনে চারবার শহরে ছুটি।”
জমির জন্য বীজ, সার আর কীটনাশক কিনতেও শিবগঙ্গাই যান চন্দ্রা। “গতকাল ইনিয়া বায়না ধরল যে স্কুলে বড়োদিনের অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে তার একটা নতুন জামা চাই, আর চাই মানে তো তক্ষুনি চাই!” চন্দ্রার মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। বিশেষত ধানের মরসুমে চাষবাসে সাহায্যের জন্য দিনমজুরদের মাইনে সহ তাঁর আর সব বাঁধাধরা খরচাপাতির জোগান আসে সবজি বিক্রি করে। “কয়েক হপ্তা প্রায় ৪,০০০ টাকা আয় করি। কিন্তু দাম পড়ে গেলে এই টাকার অর্ধেকও পাই না।” ক্ষুদ্র চাষি চন্দ্রা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজারে বসে তাঁর নিজের খেতের সবজি বিক্রি করেন। তাতে করে পাইকারি বিক্রেতার থেকে যত পেতেন তার চেয়ে প্রতি কিলোয় ২০ টাকা মতো বেশি আয় হয়।

Roy Benadict Naveen
সন্ধে না গড়াতেই সাধারণত ঘরে ফেরেন তিনি, ততক্ষণে বাচ্চারাও স্কুল থেকে চলে আসে। মা খেতের কাজে ব্যস্ত থাকাকালীন ধনুশ আর ইনিয়া মাঠে খেলা করে। এরপর তিনজনে একসঙ্গে বাড়ি ফেরে। স্কুলের পড়াশুনো সেরে, একটু টিভি দেখে, কুকুর ছানা আর গিনিপিগদের সঙ্গে খেলা করে ধনুশ আর ইনিয়া। "আমার মা ভাবে গিনিপিগ কোনও কাজের না। মা তো এগুলোকে ইঁদুর বলে, আর আমি এসব ছেড়ে কেন ছাগল পুষলাম না এই নিয়ে আমায় ধাতানি দেয়," খাঁচা থেকে নাদুসনুদুস একটা গিনিপিগকে খপ করে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে হাসেন চন্দ্রা। "কিন্তু আগের হপ্তায় ওদের জন্য যখন গাজর কিনছি, তখন আমায় একজন জিজ্ঞেস করলেন এইগুলো বিক্রির জন্য রেখেছি কিনা।” খানিক লাভ মিললে গোলগাল লোমশ জন্তুগুলোকে হয়তো বিক্রি করার কথা ভাববেন চন্দ্রা।
এই না হলে চন্দ্রা! একই সঙ্গে রসিক এবং বুদ্ধিমতি - সবচাইতে ওঁচা জিনিসটার মধ্যে থেকেও ভালোটুকু বার করে আনতে তাঁর জুড়ি নেই। এক সারি নারকোল গাছের পাশ দিয়ে আসার সময় একটু কাঁচুমাচু মুখে আমায় জানালেন আজকাল এসব গাছে চড়া ছেড়ে দিয়েছেন। “কি করে চড়ি বলুন তো? একটা আট বছুরে ছেলের মা তো আমি, নাকি!” ঠিক পরক্ষণেই তাঁর আলোচনায় উঠে আসে অন্য রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। চেন্নাইয়ের বন্যা আর কৃষকদের কীভাবে তুচ্ছ করা হয় সেসব প্রসঙ্গও বাদ যায় না। “কোনও আপিস-কাছারি কিংবা ব্যাঙ্কে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলে তাঁরা বলেন এককোনায় গিয়ে দাঁড়াতে।” চন্দ্রা সপাট প্রশ্ন তোলেন, যাঁরা তোমার মুখের ভাত জোগাচ্ছে, তাঁদের জন্য চেয়ার কই হে বাপু?
অনুবাদ: অর্ণা দীর্ঘাঙ্গি
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
Donate to PARI
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/small-farmer-big-heart-miracle-bike-bn

