পালামুর চৈনপুর ব্লকে অবস্থিত কঙ্কারি গাঁয়ে নন্দু বাদে আর খুব বেশিজন রাখালিয়া পড়ে নেই। এ রাজ্যে ছ'লাখের অধিক ভেড়া আছে বটে, তবে ছাগলের সংখ্যা ৮৮ লক্ষ — যার সুবাদে ছাগপালনেও এ রাজ্য প্রথমসারিতে রয়েছে। পাশাপাশি ১ কোটি ১০ লাখ গরু তো রয়েইছে। গরু, ছাগল, ভেড়া — সকল প্রাণীই কমন গ্রেজিং গ্রাউন্ডস্ বা সাধারণ চারণভূমির উপর নির্ভরশীল।
“একেকদিন ঘাসজমির সন্ধানে ১২-১৩ ক্রোশ [আনুমানিক ৪০ কিলোমিটার] হাঁটতে হয় আমাদের,” নন্দুর তুতো-দাদা রামরতি পাল (৬২) জানালেন। “আগে আগে মগর ঘাস আর অন্যান্য ঘাসে ভরা থাকত দোহার। তবে আজ সেসবও আর দেখা যায় না।”
এই এলাকার দোহার বা প্রাকৃতিক জলাশয়ের ধার বরাবর প্রচুর পরিমাণে একপ্রকারের মোটা মোটা খসখসে ঘাস গজায়, স্থানীয় লব্জে তার নাম মগর। প্রধানত এই ঘাস পশুখাদ্য হিসেবে ইস্তেমাল হয়, আর জলা জায়গা ছাড়া বাঁচে না। জলাশয় কমে আসায় এই ঘাসও গায়েব হয়ে গেছে।
এমনকি খেত-খামারেও আর আগের মতো চরে খাওয়ার রসদ পাচ্ছে না গবাদি পশুরা। এককালে চান্না (ছোলা) আর চাকাওয়াড় (চাকুন্দা বা সেন্না অবটুসিফোলিয়া) চাষ হত, ফসল কাটার পর তাদের বীজ পড়ে থাকত মাটিতে, অথচ এখন জনাকয় চাষি বাদে এসব আর কেউ ফলায় না, অধিকাংশ লোকে ভুট্টা, ধান আর গম চাষ করে — এসকল শস্য কাটার পর ভেড়ার খাওয়ার মতো কোনও উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকে না। “ভেড়াগুলো আর আগের মতন পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। এখন যেদিকেই তাকান শুধু রুখা-সুখা সাভানা ঘাস আর খানিক খানিক দুব্বো [সাইনোডন ড্যাকটাইলন],” নন্দু বললেন।
পরপর দু'বছর (২০২২ ও ২০২৩) খরা এসে এই তল্লাটের অসংখ্য পুকুর-ডোবা শুষে নিয়েছে, বাকি জলাশয়গুলো দূষিত। বিগত দশকে বহু জলাশয় অদৃশ্য হতে দেখেছেন নন্দু পাল, তাঁর জবানে: “ভেড়ার জিন্দা থাকার জন্য পরিষ্কার পানির প্রয়োজন।”
গতবছরের খরায়, “আরেকটু হলেই আমরা হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম। সারাটা দিন চরে বেড়ানোর পরেও ভেড়াগুলো ভুখা থাকছিল,” ঈষৎ চেঁচিয়ে উঠলেন নন্দু। তারপর, খানিক চুপ থেকে জানালেন, “গেল বছর [২০২৩] কুড়িটা ভেড়া হারিয়েছি।”
সম্প্রতি ভেড়ার পালকে নিউমোকক্কাল রোগের থেকে বাঁচাতে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন নন্দু ও তাঁর সাথীরা। তাঁদের বক্তব্য, অদূষিত পানীয় জল না থাকায় এসকল অসুখের সম্ভাবনা লেগেই থাকে।