নিয়মগিরি। এ অঞ্চলে খননকার্য চালাতে মরিয়া প্রভাবশালী বহুজাতিক সংস্থা বেদান্তর বিরুদ্ধে ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। গত সপ্তাহ অবধিও তো কস্মিনকালে এ তল্লাটে পা রাখিনি, তাহলে এই লেখার শিরোনাম ‘ফিরে দেখা নিয়মগিরি’ কেন? তার খানিকটা কারণ হল, এই জায়গা নিয়ে এত কিছু পড়েছি, সহকর্মীদের মুখে এত গল্প শুনেছি, মনে হয় যেন এর আগেও এসেছি এখানে। বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের কাছে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ বলে আখ্যা পাওয়া ওই সংগ্রামে কেমন করে পত্রপাঠ পিছু হঠতে হয়েছিল কোম্পানিকে, সে তো আজ কিংবদন্তি। কিন্তু লোকগাথারও তো সরলীকরণ হয়। তাই যে উদ্দেশ্যে গত সপ্তাহে সত্যিই নিয়মগিরি গেছিলাম সেটাই এই প্রবন্ধের শিরোনাম নির্বাচনের দ্বিতীয় কারণ – সোজা কথায়, খনন-বিরোধী লড়াইয়ের চলতি আখ্যানকে ছাপিয়ে আসলে এই কিংবদন্তিকেই ‘ফিরে দেখা’।
ওড়িশার দক্ষিণ-পশ্চিমে বসবাসরত ডোঙ্গরিয়া কোন্ধরা ভারতের তথাকথিত 'বিশেষভাবে বিপন্ন আদিবাসী জনজাতি' বর্গটির অন্তর্ভুক্ত। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন বিশ্বদর্শন ও লোকাচার তাঁরা আজও আগলে রেখেছেন। তাঁদের জীবনযাপনে আজও মূর্ত হয়ে ওঠে জ্ঞানের নানা রূপ, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক – যা বহু ক্ষেত্রেই হারিয়ে গেছে তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষের জীবন থেকে। তাঁদের সবকিছুই রাষ্ট্র বা শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির কাছে সাক্ষাৎ 'পিছিয়ে পড়ার' নমুনা হতে পারে। যেমন, সাক্ষরতা না থাকা, সাদামাটা প্রযুক্তি, ঝুম চাষ, সর্বপ্রাণবাদী ভাবনা, স্কুল ও হাসপাতালের অভাব, গ্রামের কাঁচা রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ না থাকা আর এমনি নানান কিছু। তবুও এই সব বাঁধাধরা চিন্তাভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, তাঁরা আপাতত যাবতীয় 'সভ্য' অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান কর্পোরেট আগ্রাসনকে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছেন। (এও শোনা যাচ্ছে, ওই অঞ্চলে খননের অনুমতি খারিজ হওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টাবে – সেই আশায় এখনও বসে আছে বেদান্ত, বিশেষত যেহেতু এখন দিল্লিতে কংগ্রেসের থেকেও বেশি কর্পোরেটপন্থী সরকার ক্ষমতাসীন)। তবে ডোঙ্গরিয়া কোন্ধরাও চোখ-কান খোলাই রেখেছেন যথাসম্ভব, কোনও ভাবেই কোম্পানিকে ঢুকতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁরা অনড়।
আমি আর কয়েকজন সহকর্মী মিলে নিয়মগিরি গিয়েছিলাম, তথাকথিত উন্নয়ন ও উন্নত জীবনযাপন সম্পর্কে ডোঙ্গরিয়া কোন্ধদের মতামত জানতে। তাঁরা খননকার্য রুখেছেন, তাই বলে কি তাঁরা উন্নয়নের ধারণাটারই পরিপন্থী? তাঁরা যেমনি আছেন, বেশ আছেন – এমনটাই কি তাঁদের মনে হয়? 'বাইরে' থেকে আসা সবকিছুই কি তাঁরা নাকচ করতে চান, নাকি কিছু জিনিস গ্রহণ করতেও ইচ্ছুক – যেমন ধরা যাক, সরকারি যোজনা? তাঁদের জনগোষ্ঠীর অন্দরেও কি মতপার্থক্য আছে?
বেশ কিছু ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ গ্রাম ঘুরে দেখে ও আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই খনন নাকচের সিদ্ধান্তের পেছনে রীতিমতো শক্তিশালী এক আধ্যাত্মিক ও যুক্তিযুক্ত দিক খুঁজে পেলাম। এই পার্বত্য এলাকায় লোকজন দৈবশক্তির উৎস হিসেবে নিয়ম রাজাকে খুব মানে। তাঁর আইনমাফিক এ অঞ্চলের সকল জল-জঙ্গল রক্ষা করতে হবে, সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার বদলে যৌথ মালিকানা থাকবে, শ্রম আর শ্রমের ফল সবাই সমান ভাগে ভাগ করে নেবে। এরকম সমাজব্যবস্থাতে খনি-খনন, রাস্তা কি কলকারখানা বানানো –সবরকম অনুপ্রবেশই একধরনের অমঙ্গলের সূচক ও নিষিদ্ধ। লাড্ডো সিকাকা ও দধি পুসিকার মতো নেতারা সাফ জানিয়ে দেন, তাঁরা চান না নিয়মগিরির পরিণতি হোক মুনিগুড়া বা ভুবনেশ্বরের মতো – যেখানে জল খেতে বা বাতাসে শ্বাস নিতে গেলেও অসুস্থ হওয়ার ভয় থাকে, বাড়ি ফাঁকা রেখে বেরোতে হলে তালা ঝুলিয়ে বেরোতে হয়, আর মহিলারা যেখানে নিত্যদিন হয়রানির শিকার হন। এই এলাকার মধ্যে দিয়ে রাস্তা তৈরি হলে, শাসক ও শোষকরাও এইখানে মৌরসিপাট্টা গাড়বে – এ কথা তাঁরা বেশ বুঝেছিলেন। বনাধিকার আইনের আওতায় আলাদা জমি পেলে ব্যক্তিগত মালিকানার ঝোঁক ও অরণ্য ধ্বংস বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় তাঁরা দাবি তুলেছেন: পুরো ভূখণ্ডটিকেই যেন আইনের আওতায় বাসস্থানের স্বীকৃতি দিয়ে নিয়ম রাজার একক মালিকানায় রাখা হয়।
খিড়কি পথে অনুপ্রবেশ
দুঃখের বিষয় এই যে, বহু অনুপ্রবেশ ঘটে গিয়েছে ইতিমধ্যেই, কখনও তা রীতিমতো ছলেবলে, গোপনে। আপাতঅর্থে ভালো চেয়ে কিন্তু আগাগোড়া উৎকট 'জনকল্যাণ' প্রকল্পের নাম করে রাষ্ট্র তার 'সভ্যতার' সুফলগুলি পৌঁছে দিতে গেছে আদিবাসীদের কাছে। যেসব গ্রামে স্কুল আছে, বড়োই বেহাল দশা সেগুলোর। তাই আদিবাসী শিশুদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গ্রাম থেকে দূরে আশ্রমশালা বা আবাসিক স্কুলে, যেখানে ডোঙ্গরিয়া কোন্ধদের মাতৃভাষা কুই-এর বদলে ওড়িয়া ভাষায় পড়ানো হয়। মূলধারার সংস্কৃতিকে আদিবাসী সংস্কৃতির ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বহু রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক বিশিষ্টজনের সমর্থনে চলা ভুবনেশ্বরের এক নামজাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইদানীংকালে হাজার হাজার আদিবাসী শিশুকে ওড়িশার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিয়ে এসে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি যে মোটারকম কর্পোরেট তহবিলে চলে, সেইসব কর্পোরেট আবার আদিবাসী এলাকায় খনি ও শিল্প গড়তে আগ্রহী। তাই অনেক সমাজকর্মী প্রশ্ন তুলছেন, এটি আসলে শিক্ষা, না কি মগজ ধোলাইয়ের বন্দোবস্ত মাত্র?
রাষ্ট্রের পিছুপিছু চুপিসারে আসে বাজার। এতদিন অবধি ডোঙ্গরিয়া কোন্ধদের অর্থনীতিতে টাকার লেনদেন হত না। কিন্তু এখন টাকার "চাহিদা" বাড়ছে, কারণ তাঁদের যেটুকু যা কেনার দরকার পড়ত, তার দাম বেড়েছে হুহু করে। অথচ তাঁরা যেসব বেচতে নিয়ে আসেন, সেসব প্রায়শই বিকোয় বাজারমূল্যের অনেক কমে। ভারতের আরও সব আদিবাসী গোষ্ঠীর মতোই বাজারের সঙ্গে বোঝাপড়ায় বারবার নাস্তানাবুদ হচ্ছেন তাঁরা।
তার ওপর পুলিশ আর অন্য সব নিরাপত্তা বাহিনীর অনুপ্রবেশ তো আছেই। এই অঞ্চলকে নকশাল-অধ্যুষিত বলে মনে করা হয়, আর সেই সুযোগে সরকার সময়ে-সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী পাঠায় টহলদারির জন্য। আদিবাসী নেতা ও তাঁদের সমর্থকদের জেরা করা হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সহ নানা অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়, তল্লাশি চলে, নিজেদের বাসভূমিতেও যেন অনাহূত করে রাখা হয় তাঁদের।
ডোঙ্গরিয়া কোন্ধরা এই সব সমস্যাগুলো বেশ টের পান, কিন্তু কীভাবে যে এর মোকাবিলা করতে হবে সেইটা নিয়েই ধাঁধা কাটে না। তাঁদের বাড়ি-ঘরে মাটির দেওয়ালের উপর কিম্ভুতদর্শন টিনের চালাগুলোর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার যেন ঠিক এমন দ্বিধারই প্রতিচ্ছবি। এই টিনের ছাদের জন্য গ্রীষ্মকালে ঘর অসহ্য গরম হয়ে যায় বলে অনুযোগ জানান তাঁরা। তাহলে সাবেক খড়ের ছাউনির বদলে এই পরিবর্তন কেন? “কারণ সরকার আমাদেরকে টিনের ছাউনি দিচ্ছিল।” সাদা ভাত খাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করাতেও এই একই উত্তর পাওয়া যায়, অথচ স্থানীয় সব পুষ্টিকর শামাধান জাতীয় মিলেট এবং অন্যান্য বহু শস্য ছিল তাঁদের নিজেদেরই। ইদানীং বিনিময় ব্যবস্থায় হুড়মুড়িয়ে টাকার অনুপ্রবেশে কোনও সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর মিলল না যদিও। বেশ কিছু ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ পরিবার তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে ‘মূলধারার’ স্কুলে পাঠাচ্ছে, শুধুমাত্র একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায়। যদিও তাঁরা অনেকেই মনে করেন যে নিজেদের গ্রামেই স্কুল থাকলে ভালো হত, যেখানে ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাঁদের আপন কুই ভাষায় পড়াশোনা শেখাবেন, পাঠ্যক্রমে জল-জঙ্গল-জমিনভিত্তিক শিক্ষাও ঢুকবে সসম্মানে।
এক পূর্ণাঙ্গ আখ্যান
খনিবিরোধী আন্দোলনের একটা ইতিবাচক ফলশ্রুতি হল ‘নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতি’র গঠন, যা সমস্ত ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ বসতিগুলিকে সংগঠিত করেছে। এই সমিতি এখন বেআইনি মদের ভাঁটির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করছে। ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ জনগোষ্ঠীকে বিপর্যস্ত করে তোলা আরও এরকম সমস্যার মোকাবিলা করতে এখন প্রস্তুত এ মঞ্চ।
আমরা যতটুকু যা কথাবার্তা বলতে পেরেছি, তার ভিত্তিতে সবকটা জটিল প্রশ্নের প্রতি সুবিচার করা অসম্ভব। তবে নিয়মগিরিকে একটা অঞ্চল হিসেবে তো বটেই, আখ্য্যান হিসেবেও যে আবার ফিরে দেখা জরুরি সেকথা বুঝতে বাকি থাকেনি। অতীত ও ভবিষ্যৎ বিষয়ে ডোঙ্গরিয়া কোন্ধদের নিজস্ব বোধের ওপর ভিত্তি করে তাঁদেরকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করার ভার দিতে গেলে একজন শুভাকাঙ্খী বহিরাগত মানুষের গভীর সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া থাকা দরকার। ডেভিড বনাম গোলিয়াথের গল্প রক্ত-গরম করে তোলে, বেশ চনমনে রাখে আমাদের, প্রেরণাও জোগায়। তবু তা সম্পূর্ণ নয়। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্র ও বাজার দুই'ই তাঁদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। ডোঙ্গরিয়া কোন্ধ জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও সরকারের আন্তরিক ও যৌথ প্রয়াসেই একমাত্র এই গভীর সংকটে পথের দিশা দেখতে পাবে এই আদিবাসী সমাজ। জানতে পারবে কেমন করে বাকি বিশ্ব তাঁদের কাছে শিখতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে, এক পরিপূর্ণ জীবন যাপনের উপায়।
এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য হিন্দু পত্রিকার ২ জানুয়ারি সংখ্যায়:
http://www.thehindu.com/opinion/op-ed/comment-on-niyamgiri-and-fight-between-dongria-kondh-tribal-group-and-vedanta/article6745650.ece
অনুবাদ: সৌম্যদীপ ঘোষ
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী


