দক্ষিণ দিল্লির কোনও এক পাব-এ বসে, বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন তিন বন্ধু মিলে যে টাকাটা অনায়াসেই বিয়ারের পিছনে উড়িয়ে দেয়, মীরাটের খেরকি গ্রামে ঈশ্বরীর সতেরো জনের পরিবারের সারা মাসের আয় ঠিক ততটুকুই। ফুটবল সেলাই করে মাস গেলে তাঁরা হাতে পান ওই হাজার খানেক টাকা। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির যাবতীয় কাজ সেরে নেন মহিলারা, একটু বড়ো বয়সের ছেলেমেয়েরাও হাত লাগায়। বাড়ির পুরুষেরা নিজনিজ কামধান্ধায় বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই শুরু হয় তাঁদের টানা সাত ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রম। ঈশ্বরী, যাঁর বয়স এখন ষাটের বেশি, জানাচ্ছেন যে বাড়ির মহিলারা এই কাজ করলে পুরুষদের তেমন একটা আপত্তি নেই, কারণ ফুটবল তৈরির সরঞ্জাম আনা আর বানানো হয়ে গেলে সেগুলো পৌঁছে দেওয়া ছাড়া তাঁদের ঘর থেকে বেরোনোর খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না। তাঁদের পরিবারের আর্থিক ভরসা বলতে একচিলতে কৃষিজমি। মীরাটের আশেপাশে প্রায় পঞ্চাশটি গ্রামে এই ফুটবল সেলাইয়ের পেশায় যুক্ত বাকিদের অবশ্য এমন কোনও বাড়তি আয়ের পথ নেই।
ঈশ্বরীর পরিবার দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত; মীরাটের চারপাশে এই গ্রামগুলোতে যাঁরা ফুটবল সেলাইয়ের কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান অথবা জমিহীন দলিত শ্রমিক। দিনে গড় সাত ঘণ্টা খাটনির পর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তিনটি ফুটবল তৈরি করতে পারেন, আর ছোটোরা মেরেকেটে দুটি। ছোটো বা মাঝারি সাইজের ফুটবলের জন্য তাঁদের তিন টাকা করে দেওয়া হয়, আর বড়োগুলোর জন্য ৫ টাকা। ছয়জনের একটি পরিবার দিনে প্রায় আটটির মতো ফুটবল বানালেও, মাস গেলে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার বেশি তাঁরা আশা করতে পারেন না। এই রোজগার অবশ্য অনেকটাই চাহিদার ওপর নির্ভর করে। এদিকে স্থানীয় বাজারেও একেকটা ফুটবলের দাম পড়ে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা মতো। সেলাই খুলে গেলে আবার ঠিকাদাররা মেরামতির খরচ সেই শ্রমিকদের মজুরি থেকেই কেটে নেন। আর ব্লাডার ফুটো হয়ে যাওয়া মতো গুরুতর কোনও ক্ষতি দেখা গেলে, তার পুরো খরচটাই তোলা হয় কারিগরদের কাছ থেকে।
বলা হয় ফুটবল বানানোর ব্যাপারে পাকিস্তানের পরেই দ্বিতীয় স্থানে আছে ভারত; পাকিস্তানের শিয়ালকোট এবং ভারতের জলন্ধর ও মীরাট হল এই খেলার সমস্ত সরঞ্জাম তৈরি করার প্রধান দুটি কেন্দ্র। এবারের বিশ্বকাপের জন্য শিয়ালকোট থেকে জার্মানি পাঠানো হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ফুটবল; ২০০২ সালের এই চুক্তি ছিল জলন্ধরের হাতে। বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসে, ফুটবলের চাহিদাও হু হু করে বাড়তে থাকে। কোনও কোনও ঠিকাদার তো এই সময় দিনে প্রায় ২৫,০০০ পিস পর্যন্ত বলের জোগান চেয়ে বসে। অবশ্য এই রমরমা মরসুমেও প্রতিটি বলের জন্য শ্রমিকদের পাওনা বাড়ে মোটে ৫০ পয়সা করে। কোনও ইউনিয়ন কিংবা দরদাম করার ক্ষমতা তাঁদের নেই, এমনকি সংসার চালানোর আর কোনও উপায়ও নেই; তাই গ্রামবাসীদের এসব মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও গতি থাকে না। এই টাকায় কাজ করতে অস্বীকার করলে দেখা যায় যে অন্য কেউ আরও কম টাকায় সেই কাজ করতে সহজেই রাজি হয়ে যাচ্ছে; এই অবস্থায় অন্তত কিছু টাকা তো তাঁদের হাতে আসছে, এটা মেনে নিয়েই তাঁদের দিন চলে।
ফুটবল তৈরির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সিসোলার ছোটো ছোটো ঘরবাড়ি আর সরু গলিগুলোতে প্রতিদিনের এক চেনা চিত্র হল সেলাইয়ের যন্ত্রের ওপর কুঁজো হয়ে পড়ে থাকা গ্রামের নারী আর খুদেদের শীর্ণ পিঠগুলো, এবং রঙিন রবারের টুকরোগুলোর ভেতর দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলা মেশিনের জোড়া সুঁই। সে তাঁদের হাত যতই পটু হোক না কেন, ধারালো সুঁইয়ের খোঁচা খাওয়া কিংবা সেলাইয়ের সিল্কের সুতোয় আঘাত পাওয়া, এইসব হামেশাই হতে থাকে। তার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার ফলে তাঁদের দৃষ্টিশক্তি কমে আসে। স্থানীয় সমাজকর্মী শের মহম্মদ খান বলেন, “সঠিক ভঙ্গিতে বসতে ওদের কেউ কখনও শেখায়নি, যে কারণে পিঠের সমস্যায় ভুগতে হয়।” স্থানীয় কোনও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা না থাকায় গ্রামবাসীরা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপরই ভরসা করতে বাধ্য হন। এমনকি মাঝেসাঝে ডাক্তার পাওয়া গেলেও, সেই চিকিৎসার খরচ জোগানোর সামর্থ্য তাঁদের থাকে না।



