হোয়াইট টাউন অর্থাৎ পুদুচেরির ফরাসি কলোনি সমগ্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটিতে সম্ভবত পর্যটকদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। ঐতিহ্যবাহী হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা আর্ট গ্যালারি বনে যাওয়া সুন্দর সুন্দর প্রাসাদোপম অট্টালিকায় সাজানো এই অভিজাত মহল্লায় আজও কয়েকঘর ফরাসি পরিবারের বাস। অতীত-পৃথিবীর মায়া জড়ানো হোয়াইট টাউন, পুদুচেরির বাকি অঞ্চলগুলির তুলনায় অনেক বেশি পরিছন্ন। যে শহরের নামেই ‘সাদা’, আর যাইহোক তার পরিছন্নতা নিয়ে তো কোনও প্রশ্নের অবকাশ থাকতে পারে না!
কিন্তু এই পরিছন্নতার মুখোশ আর ওপর ওপর নিখুঁত সাজসজ্জার আড়ালে চাপা পড়ে থাকে সাফাইকর্মীদের হাড়ভাঙা শ্রমের কথা – ওই যাঁদের সঙ্গে উপ-রাজ্যপাল কিরণ বেদী আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেন আর কী! কিন্তু একদিনের অনুষ্ঠানে তাঁদের প্রাত্যহিকতায় বদল আসে না কিছু। রাতভর চুপচাপ আবর্জনা সাফ করে যান এই মেয়েরা, যতটা নীরবে সম্ভব। রাত পোহালে পর্যটকদের আনাগোনা শুরুর আগেই, তাঁদের জন্য ঝকঝকে করে রাখেন করেন হোয়াইট টাউনের রাস্তাঘাট। নিশিযাপনের অর্থ তাঁদের কাছে ভিন্ন। এ রাস্তা-সে রাস্তা জুড়ে তাঁদের খাটুনির আর বিরাম থাকে না। আবর্জনা সংগ্রহ করেন, সাফসুতরো রাখেন শহরটাকে।
অথচ তাঁরা পন্ডিচেরি পৌরসভার অধীনে সরাসরি কর্মরত নন। মিউনিসিপ্যালিটি এরকম বেশিরভাগ কাজের দায়িত্বই তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হাতে। ছবিগুলোয় যে সাফাইকর্মীদের দেখা যাচ্ছে সকলেই তাঁরা ঠিকে শ্রমিক – গোটা পুদুচেরি জুড়ে এমন পরিচয়ে যে প্রায় হাজার জন কাজ করেন তাঁদেরই কিয়দংশ। মাস গেলে গড়ে মোটামুটি ৬২০০ টাকা আয় করেন তাঁরা। কাজ করার তিনটে শিফট আছে বটে তবে ছবির মহিলাদের প্রায় সবসময়েই রাতের পালার কাজ পড়ে।
নির্ঘুম এক রাতে প্রথম আমার নজরে আসেন তাঁরা। হোয়াইট টাউনে গিয়েছিলাম একটা সিনেমার শুটিং-এর কাজে। যে সপ্তাহটা ওখানে ছিলাম, প্রত্যেকটা দিন তাঁদের কাজ দেখেছিলাম মন দিয়ে, কীভাবে তাঁরা গোটা কলোনির রাস্তাগুলোকে ঝাঁ-চকচকে রেখেছেন ভেবে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম, আর আমায় নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো ব্যাপারটার মধ্যে থাকা এক অদ্ভুত প্রহসন — যার তাড়নায় এ কাজ করতে বাধ্য হন তাঁরা। প্রতি রাতে তাঁদের কাজকর্মে যতটা সম্ভব ব্যাঘাত না ঘটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে চলি আমি। এই জনাকয়েক মহিলার জীবন ক্যামেরাবন্দি করার প্রবল ইচ্ছে যেন পেয়ে বসে আমাকে। ভারতবর্ষের মেয়েদের জন্য রাতের বেলাটা যতই অসুরক্ষিত হয়ে উঠুক, এখানে এই সাফাই কর্মীরা মধ্যরাত থেকে ভোর অবধি নিরন্তর কাজ করে যান, নিরাপত্তার লেশটুকুও জোটে না।





