দিনটা যেন আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো নয়। সকালবেলা। কেন জানি ভারি ব্যস্তসমস্ত হয়ে দৌড়োদৌড়ি লাগিয়েছেন কিব্বরের মানুষজন। হিমালয়ের এত উঁচুতে ছোট্ট এই গ্রামখানায় ভারি শান্ত, ঢিলেঢালা ছাঁদে জীবন চলে। কিন্তু আজ যেন কিছু একটা ব্যতিক্রম ঘটে গেছে। ব্যাপারটা কী, একেবারেই ঠাহর হচ্ছিল না। তাই আমার নবীন প্রতিবেশী তাকপা ঘরে একবার উঁকি দেওয়ামাত্র তাকেই এত হইহল্লার কারণটা জিজ্ঞেস করে বসলাম। সে তড়বড়িয়ে জানাল, “আজ এলাকার ছেলেরা চমরী গাইটাকে ধরে আনতে যাচ্ছে যে! তাশিগাং গ্রামের কাছে মাঠে চমরীদের পালটাকে শেষ দেখেছিল 'লুকজি', মানে রাখাল। গতকাল সন্ধেয় সে পড়িমরি ছুটে গাঁয়ে এসে জানাল পালের একটা চমরী নাকি পাগল হয়ে গেছে। ভাবো একবার!" স্পিতি উপত্যকায় এমন সব জনগোষ্ঠীর বাস, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী রাখালিয়া-কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী গ্রীষ্মকালে তারা চাষবাসের পাশাপাশি পশুপালন করে রোজগারের দু'খানা রাস্তাই খোলা রাখে। লোকে সাধারণত ভেড়া, ছাগল, গাধা, ঘোড়া আর গরুই পালন করেন। তবে এদের মধ্যে সবচাইতে দরকারি পশু হল চমরী গাই। তার অনেক কারণও আছে বৈকি। খেতে চাষবাসের কাজে হাট্টাকাট্টা চমরী গাইদের মতো দুর্দান্ত সহকারী কমই মেলে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় উত্তাপের বন্দোবস্ত করতে তাদের পশম আর গোবরের কদরও কম নয়। আর ইয়াকের একেবারে সাদা ধবধবে লেজ স্থানীয় বাজারে ১০,০০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হয়। সম্প্রতি আমাদের আরেক প্রতিবেশী চুদ্দিম, মানালির এক ব্যবসায়ীর থেকে একটা চমরী গাই কিনেছিলেন। বেশ বয়স হয়েছে প্রাণীটার। সারাটা জীবন তার পর্যটকদের সঙ্গে নানান ভঙ্গিমায় ছবি তুলেই কেটেছে। মালিক নিজের হাতে খাইয়ে দিত তাকে। স্পিতিতে ওসব ভাবাই যায় না। এখানে বছরের বেশিরভাগটাই চমরী গাইগুলোকে মাঠে-ঘাটে নিজেদের মতো ছেড়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ পেট ভরাতে সবুজ ঘাসের খোঁজে লোমশ এই চারপেয়েরা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় দল বেঁধে। কিন্তু নিতান্ত প্রবীণ ওই চমরীর এত ধকল আর সইবে কেন? এমন জীবনযাপনের অভ্যেসটুকুও তো নেই! অভুক্ত থাকলেও বেচারি দিনের পর দিন তাই কেবল রোদ পোহাত বসে বসে। দেখতে দেখতে ভারি বদমেজাজি হয়ে গেল প্রাণীটা, সামনে যাকেই দেখত তাড়া করত।
গতকাল ছিল লুকজির পালা। আক্ষরিক অর্থেই প্রাণ হাতে করে ছুটতে হয়েছিল তাকে। এরপর গ্রামের একদল লোক ওই বুড়ো চমরীকে ধরে এনে একটা খোঁয়াড়ের মধ্যে বেঁধে রাখল। সেদিন থেকে আমি আমার জানলা দিয়েই এই খিটখিটে মক্কেলকে দেখতে পেতাম। সেও আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষত, যেন শাসাচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যেই দিনে-রাতে যেকোনও সময় বুক-কাঁপানো ওই আওয়াজটার সঙ্গে দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম আমি। একদিন সন্ধ্যায় গ্রামে ঢুকতেই দেখি সকলের মুখে খুশির ঝিলিক। এক গাল হেসে আমার ছোট্ট বন্ধু তাকপা বলল, “আজ মোচ্ছব আছে! মাংসের মোমো!" স্পিতি অঞ্চলে ভারি কদর এই ভাপানো পিঠের মতন পদটির, বিশেষ বিশেষ উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেই বানানো হয়। সেদিন সন্ধেবেলা গাঁ উজাড় করে লোকে হাজির হয়েছিল ভোজ খেতে – ঝাল ঝাল টমেটোর চাটনি সহযোগে মাংসের পুর-ভরা মোমো। প্রাণ ভরে ভরপেট মোমো খেয়ে, গায়ে চাঁদের আলো মেখে হাঁটা লাগিয়েছিলাম বাড়ির পথে। যে-যার ঘরে ঢুকতে যাব, হঠাৎ কেমন একটা খটকা লাগল। কী যেন একটা নেই! "বুড়ো চমরীটা কোথায় গেল?" প্রশ্নটা করেই ফেললাম। "ওই তো আমাদের মোমোর মাংস!" তাকপার মুখে দুষ্টুমির হাসি। আমার পেটের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল, মনে হল আমার ওই বদমেজাজি পড়শি পেটের মধ্যে থেকেই দাঁত কিড়মিড় করছে বুঝি।
ভারি চমৎকার প্রাণী এই চমরী গাই। হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে দেখা মেলে এদের। এক-একটা বুনো চমরীর ওজন এক টন পর্যন্ত হতে পারে! গৃহপালিত চমরী গাই আকারে-আয়তনে ছোটো হলেও মালিকদের কাছে তারা অমূল্য সম্পদবিশেষ। এদের দুধের মাখন দিয়ে তৈরি নুন চা বা নমকিন চা – হিমালয়ের কনকনে ঠান্ডায় শরীর গরম রাখতে দারুণ উপকারী পানীয়। এ অঞ্চলের মানুষ চমরীর দুধ থেকে চিজ বানিয়েও খায়। জিনিসটা স্বাস্থ্যকর তো বটেই, স্বাদেও এর জুড়ি মেলা ভার!
এই গল্পটির প্রথম সংস্করণ ১৩ অগস্ট ২০১৪ তারিখে দ্য হিন্দু সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
অনুবাদ: সুরঙ্গমা চট্টোপাধ্যায়
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী



