পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় ১০,৩৬০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য। স্বাদু আর নোনা জলে ভরা নদী-খালবিলের এপার-ওপার জুড়ে বিস্তৃত এই সুবিশাল বনাঞ্চলে অজস্র জন্তুজানোয়ার, গাছপালা, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাস। ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইটের তকমাও পেয়েছে নানান বৈচিত্র্যের টানাপোড়েনে অনন্য এই অঞ্চল।
এখানকার লোককথায় মিশে আছে প্রজন্মবাহিত বনবিবির কাহিনি। কিংবদন্তি আছে, দক্ষিণরায় (দখিন রায় নামটিও প্রচলিত) নামক এক নিষ্ঠুর ব্রাহ্মণ বাঘের ছদ্মবেশে মানুষের পিছু নিত, তাদের মেরে খেয়েও ফেলত। দক্ষিণরায়ের জুলুম থেকে এখানকার মানুষকে বাঁচানোর জন্য সুদূর আরবদেশ থেকে বনবিবিকে এই আঠেরো ভাটির দেশ সুন্দরবনে পাঠানো হয়। ধর্ম-সম্প্রদায় আলাদা হলেও দৈনন্দিন নানান বিপদ-আপদে সকলে এখানে পরস্পরের শরিক। তাই সেসব বিপদ দূরে রাখতে হিন্দু আর মুসলিম পুরাকথাগুলি মিলেমিশে গেছে। ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে জীবনযাত্রার এহেন মেলবন্ধন একমাত্র বুঝি সুন্দরবনেই মেলে।
এখানে নদীর গতিপথের আশেপাশে প্রায়ই দেখা যায় খড়ের ছাউনি-দেওয়া দেবীর থান, সেখানে রাজা দক্ষিণরায়ের পিঠে আসীন দেবীর মূর্তি, সঙ্গে তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলি। বাঘের রাজত্বে ঢোকার আগে মধুসংগ্রাহক আর জেলেরা মাথা ঠুকে যান এসব জায়গায়, বন্দনা শোনা যায় থান থেকে – "মা বনবিবি আল্লাহ, আল্লাহ" ডাকের সঙ্গে অনায়াসে মিশে থাকে "বাবা দক্ষিণরায় হরি হরি" ধ্বনি।
সুন্দরবনের দ্বীপবাসী মানুষ বিশ্বাস করেন এই জঙ্গল শুধু গরিব মানুষের জন্য, তাছাড়া যাঁদের নিজেদের বাঁচার জন্য যেটুকু দরকার তার বেশি কোনও চাহিদা নেই, তাঁদের জন্য। এ অঞ্চলে দিন কাটাতে গেলে 'নিষ্পাপ মন' আর 'খালি হাত' – এই দুটো বিষয়কে অপরিহার্য মনে করেন এখানকার বাসিন্দারা। মানুষ আর জঙ্গলের অন্যান্য বাসিন্দাদের মধ্যে এই অলিখিত 'চুক্তি' দু'পক্ষকেই জঙ্গলের উপর নির্ভর করে বাঁচতে আর পরস্পরের চাহিদাকে সম্মান করতে শেখায়। কোনও রকম লোভ বা হিংস্র উদ্দেশ্য ছাড়া জঙ্গলে যাওয়া বোঝাতে 'পাপমুক্ত মন' কথাটা বলা হয়। আর 'খালি হাত' বলতে বোঝায় জঙ্গলে ঢোকার সময় বন্দুক-টন্দুক সঙ্গে না নেওয়া।
বনবিবির মধ্যে এই বাদাবনই যেন মূর্ত হয়ে ওঠে, আর তাঁর প্রতি গ্রামবাসীদের অবিচল আস্থায় প্রকাশ পায় বন ও বাঘ সংরক্ষণের প্রতি এইসব মানুষের দায়িত্ববোধ। সুন্দরবনের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছে 'বনবিবি যাত্রা' নামে একটি শিল্পকলা, যাতে স্থানীয় শিল্পীরা লোকদেবীকে ঘিরে প্রচলিত নানান বীরগাথার নাট্যরূপ দেন। এই যাত্রাগুলি খানিক অতিনাটকীয় হলেও এদের অন্তর্নিহিত বার্তাটি একেবারে স্পষ্ট – "জঙ্গল টিকলেই বাঘেরা টিকবে, আর তবেই আমরা খেয়েপরে বাঁচতে পারব।"
পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল – আঠেরো ভাটি আর এক পিরানির দেশ সুন্দরবনের বাসিন্দাদের চিন্তা-চেতনা, জীবনবোধকে ঘিরেই এই তথ্যচিত্রের প্রয়াস। তথ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও অ্যানিমেশন ছবির জন্য আয়োজিত, ২০১৪ সালের ১৩তম মুম্বই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের কমপিটিশন বিভাগে এটি সরকারি মনোনয়ন পায়।
অনুবাদ: সুদর্শনা মুখোপাধ্যায়


