আরহেন তাঁদের গ্রামের শেষ উল্কি শিল্পী।
খড় দিয়ে ছাওয়া লম্বাটে তাঁদের ঘর, সাবেকি কায়দায় বানানো কোনয়াক কুঁড়েঘরের বাইরে বসে অশীতিপর আরহেন তাঁর ছোটোবেলায় শেখা গান গাইছেন। উল্কি করার সময়ে গাওয়া হত এই গান।



আরহেন তাঁদের গ্রামের শেষ উল্কি শিল্পী।
খড় দিয়ে ছাওয়া লম্বাটে তাঁদের ঘর, সাবেকি কায়দায় বানানো কোনয়াক কুঁড়েঘরের বাইরে বসে অশীতিপর আরহেন তাঁর ছোটোবেলায় শেখা গান গাইছেন। উল্কি করার সময়ে গাওয়া হত এই গান।
রেন-আম মান্যু, না হোংখু তো
গোলিং নি
ফোং খাত তাকা, চিলাম নাম্পো মে নিওইহাই
[যেদিন সোনা রেন-আম মান্যু
উল্কি করবে কোলে
বেরিয়ো নাকো খেতের মাঝে
রও চিলামে বসে]।
রাজকন্যা রেন-আম মান্যু উল্কি করাচ্ছেন। চিলাম হল মরুং-এর নাম (আগে যেখানে পুরুষরা দেখাসাক্ষাৎ করতেন)।
জীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে এবং নানান গুরুত্বপূর্ণ দিনে উল্কি করানোটা আদতে কোনয়াকদের (রাজ্যে তফসিলি জনজাতি হিসেবে নথিভুক্ত) নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচিতিরই অঙ্গ ছিল। ধীরে ধীরে ১৯৬০-৭০ নাগাদ এই সংস্কৃতি ফিকে হতে থাকে। তার পরেও অবশ্য মোটামুটি এক দশক উল্কি করানোর প্রথা চালু ছিল। ১৯৭০ সালে এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। খ্রিস্টান ধর্মের আগমন এবং কোনয়াক ছাত্র ইউনিয়নের প্রভাবে প্রথাটি হ্রাস পেতে পেতে ক্রমশ স্তব্ধ হয়ে যায়।

Swadesha Sharma

Swadesha Sharma

Sarbajaya Bhattacharya
তারপর প্রায় অর্ধ শতক পার করে এই এপ্রিল মাসের উষ্ণ সকালে পারির সঙ্গে দেখা হয় আরহেন এবং শিয়াংহাচিংন্যু-নিবাসী আরও কয়েকজন উল্কি শিল্পীর। মোন জেলার উপরের দিকে অবস্থিত এই গ্রাম ভারত-মায়ানমার সীমান্তের খুব কাছে।
গ্রামের আনুমানিক ৫০০০ বাসিন্দা তৈরি হচ্ছিলেন আওল্যাং উৎসবের জন্য। বাৎসরিক ছয় দিনের বসন্ত উৎসব আওল্যাং, যেখানে নতুন ঝুম খেতে বীজ বোনার পর গোটা সম্প্রদায়ের মানুষ জড়ো হয়ে দেবতাদের আশীর্বাদ চান, ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করেন। এই সমাজে আজও ঝুম চাষ পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কাছেপিঠের গ্রাম থেকেও মানুষ এসে হাজির হয়েছেন আং-এর বাড়ির নিকটবর্তী মাঠে। অনেকেই তাঁদের জনজাতির নিজস্ব পোশাকে সেজে এসেছেন, বিশেষ করে সেইসব মানুষজন যাঁরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। উৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও বসন্তের দখিনা বাতাস ভরে উঠছে সুরেলা গানে, বাজনার শব্দে।
নাগাল্যান্ডের বেশিরভাগ কোনয়াক গাঁয়ের মতো, শিয়াংহাচিংন্যু গ্রামও পাহাড়চূড়োয় অবস্থিত। কয়েক শতক আগে নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত – ওপর থেকে যাতে শত্রুসৈন্যের সহজেই দেখা মেলে। এককালে মরুং ছিল শুধুমাত্র পুরুষদের দেখা করার জায়গা। এখনও গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়েছে রয়েছে অনেক মরুং। তাদের দেওয়ালে বিভিন্ন পশুর খুলি – সে কোনও কালের শিকারের স্মৃতি। মহিলারা এখন মরুং-এ আসতেই পারেন। বেশ বড়োসড়ো এই ঘর সাধারণত কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি। কিন্তু মরুং-এর পুরানো সংস্কৃতি – যে ঘরে কোনয়াক ছেলেরা পুরুষ হওয়ার পাঠ নিত – সে অনেক দিন আগেই চুকেবুকে গেছে। এখন এই ঘরগুলো বিশ্রামের স্থান। আবার আড্ডা দেওয়ার জায়গাও বটে।
অন্যান্য কোনয়াক গ্রামের মতো এখানেও সমাজ পরিচালনা করেন প্রধান আং – উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে। তবে সম্প্রতি তৈরি হয়েছে গ্রাম কাউন্সিল। তাতে নির্বাচিত সদস্য রয়েছেন। কোনয়াকদের জীবিকা বলতে মূলত কৃষিকাজ। এখানকার প্রধান ফসল ধান। জমির মালিকানা গোষ্ঠীগত হলেও তার তদারকির ভার বর্তায় আং- এর উপর। সকলে যৌথভাবে এই জমি চাষ করেন। উৎপন্ন ফসল সবার মধ্যে বণ্টিত হয়।

Sarbajaya Bhattacharya

Sarbajaya Bhattacharya

Swadesha Sharma

Swadesha Sharma
*****
উৎসব শুরু হবে-হবে করছে। অনেকে এদিক-ওদিক চক্কর দিচ্ছেন, অনেকে আবার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন।
গান সাঙ্গ করে আরহেন এবার বলতে শুরু করলেন উল্কি করার পদ্ধতির কথা। প্রথমে উনুনে সেঁকে নিতে হবে এক টুকরো কয়লা। ওপরে রাখা থাকবে একটা খালি হাঁড়ি। ধোঁয়াতে সেই হাঁড়ির মধ্যে জমা হবে কয়লার কালি। সেই কালি চেঁছে নিয়ে উল্কি করার জন্য ব্যবহার করা হবে। সেই সঙ্গে লাগবে ইং [স্ট্রোবিলান্থেস পেন্সটেমোনোইডেস] গাছের কাঁটা। কাঁটা দিয়ে চামড়ার ওপর ফোটানো হবে, নয়তো হাতুড়ির মতো করে ঠুকে ঠুকে আঁকা হবে।
কিশোরী, অপটু আরহেন উল্কি করতে বেশ ভয়ই পেয়েছিলেন। “আমার আনিয়া [মা] আমাকে শিখিয়েছিলেন,” ৮৬ বছরের প্রবীণা বললেন।
“ইং গাছ থেকে কালো কালি পাওয়া যায়,” তিনি বলে চলেন। বোঝাতে থাকেন উল্কি পদ্ধতির খুঁটিনাটি। এই কালি সংগ্রহ করা হতো, সেই সঙ্গে গাছের কাঁটা – উল্কি করার অপরিহার্য উপকরণ। তারপর সেই কাঁটা কালো কালিতে ডুবিয়ে শুরু হতো উল্কি আঁকা। “রক্ত আর কালি মিশিয়ে গাঢ় একটা রং তৈরি হত,” জানালেন তিনি। নরম কাপড় উষ্ণ গরম জলে ভিজিয়ে উল্কির জায়গাটা মোছা হত। একটা উল্কি করতে লেগে যেত গোটা একটা দিন।
আরহেন ১৪০ জনের উল্কি করেছেন। ঘুরে বেরিয়েছেন তাঁর স্বামীর অধীনে থাকা ছ’খানা গ্রামে। কিন্তু প্রথম করা উল্কি এখনও মনে আছে তাঁর। “একজন মেয়ের পায়ে আর একজন ছেলের বুকে,” পুরানো দিনের কথা বলতে বলতে হাসি ফুটে ওঠে বৃদ্ধার ঠোঁটে। এখন এই সবই শুধু স্মৃতি।

Swadesha Sharma

Swadesha Sharma
*****
মহিলা এবং পুরুষদের উল্কি বরাবরই আলাদা। মহিলারা উল্কি করাতেন জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে – যেমন বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে অথবা বিয়ে করার পর। তাঁদের কিছু কিছু উল্কি আবার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বীরগাথার চিত্রায়ন।
“একজন কোনয়াক মহিলার জীবনে অনেক রকম বদল আসে। সে জন্মায় তার বাবার বংশে, আবার বিয়ে হয়ে যায় অন্য বংশে। কিন্তু বিয়ের আগে করা উল্কি তার সঙ্গে থেকে যায় সারা জীবন। এমনকি মৃত্যুর পরেও। এটাই একমাত্র চিহ্ন যা বদলায় না। এই চিহ্ন তার পরিচিতি,” বললেন আমো কোনয়াক।
মোনের এই বাসিন্দার মনে আছে তাঁর দাদু-ঠাকুমার উল্কি। “ছোটোবেলায় আমি অনেক সময় উল্কির গল্প শুনেছি। কেমন করে করা হত, কতটা ব্যথা লাগত, হয়ে গেলে মানুষ কত গর্ব বোধ করত। লোককাহিনির মতো এই গল্পগুলো এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যেত। আমার কাছে এই উল্কিগুলো যেন স্মৃতির মানচিত্র। শুধু চামড়ায় নয়, এই আঁকিবুঁকি তাঁদের অতি নিজস্ব পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে,” ৩২ বছরের এই গবেষকের গলায় মায়াজড়ানো সুর।
কোনয়াকরা ছিলেন যোদ্ধা। যুদ্ধ জয়ের চিহ্ন হিসেবে পুরুষদের শরীরে উল্কি করা হত। এই নিয়ে যা গবেষণা হয়েছে, তা পুরুষদের যুদ্ধজয়ের কাহিনির ওপরেই জোর দিয়েছে বেশি। আমোর মনে হয় মহিলাদের কথা সেখানে যথেষ্ট স্থান পায়নি। অগোচরে থেকে গেছে উল্কির পেছনের গল্পকথাও। আমোর মনে আছে তাঁর দিদার কাছে শোনা উল্কির কাহিনি। “উনি আমাকে বলতেন যে উল্কি করাতে খুব ব্যথা লাগত, চামড়া ফেটে রক্ত পড়ত, ফুলে উঠত। কিন্তু পরে কত গর্বিত বোধ করতেন, কত সুন্দর লাগত তাঁর নিজেকে।”
এই গ্রামেই থাকেন ননফে। বয়স তাঁর সত্তরের ঘরে। তিনি দিদি আর তুতো-বোনেদের থেকে শিখেছিলেন উল্কি করতে। কিন্তু নিজে কোনও দিন উল্কি করার সুযোগ পাননি। কারণ উল্কি করার ‘বিশেষ অধিকার’ শুধু রানি, অর্থাৎ আং-এর প্রথম স্ত্রী-এর জন্য সংরক্ষিত। ননফে রানিকে সাহায্য করতেন। জঙ্গল থেকে নিয়ে আসতেন গাছের কাঁটা, রান্না করতেন, আর যাঁর উল্কি করা হচ্ছে তাকে শক্ত করে ধরে থাকতেন, পাছে ব্যথায় তারা ছটফট না করে ওঠে। কথা বলতে বলতে বেদনার ছাপ মুখে ফুটিয়ে তুললেন ননফে। তারপরেই হেসে ফেললেন এই পুরনো হয়ে যাওয়া স্মৃতির কথা ভেবে।
পারি যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেল, তিনি তখন বাঁশের তৈরি একটা ঘরে বসে ছিলেন। আং-এর বাড়ির চত্বরে এরকম বেশ কয়েকটি ঘর আছে। মৃদু স্বরে কথা বললেন, মাঠ থেকে উৎসবের উল্লাসের আওয়াজে সেই স্বর মাঝে মাঝে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। ছবি তোলবার কথা বলতে নিজে থেকেই খুশি মনে গিয়ে পরে এলেন সাবেকি পোশাক আর গয়না।

Sarbajaya Bhattacharya

Ritu Sharma
কাঁধে, পায়ে আর হাতে যে উল্কি আছে ননফের সেগুলো সবই বিয়ের আগের। উল্কিগুলো গয়নার মতো, বললেন ননফে। আরও বললেন, “আমরা তখন যে পোশাক পরতাম, সেগুলো খাটো ছিল। তাই উল্কি ছিল শরীর ঢাকার একটা উপায়।” কাঁধের উল্কিটাই ননফের সবথেকে প্রিয়। “আমার এক দিদি করে দিয়েছিল তো,” হাসিমুখে বললেন তিনি, “তাই এটাই আমার সবথেকে পছন্দের।”
প্রথম উল্কি যখন করা হয়েছিল, ননফে তখন লিয়াংহা গ্রামের এক কিশোরী। এই গ্রামও নাগাল্যান্ডের মোন জেলারই অংশ। “এত ব্যথা লেগেছিল যে কেঁদে ফেলেছিলাম,” তিনি জানালেন।
বিয়ের পর প্রথম উল্কি করান উরুতে। রানি করেছিলেন সেই উল্কি। আং-এর প্রথম স্ত্রী, যিনি আবার ননফের দিদিও বটে। কোনয়াক প্রথা অনুযায়ী কৌমের সর্দারদের মধ্যে বহুবিবাহের প্রচলন ছিল। কিন্তু বাকি সমাজে একগামিতাই ছিল রীতি।
দ্বিতীয় স্ত্রী বলে ননফে কোনও দিন তু (উল্কি) করেননি। শিয়াংহাচিংন্যু গ্রামে তিনি রান্নাঘর আর চাষের জমিতে কাজ করতেন। বাড়ির বাচ্চাদের দেখাশোনা করতেন।

Swadesha Sharma

Swadesha Sharma

Swadesha Sharma

Swadesha Sharma
*****
নাগাল্যান্ডে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের সঙ্গে প্রথম সংস্পর্শে আসে তামলু, কাংচিং, ওয়াকচিং এবং ওয়ানচিং গ্রাম। খ্রিস্টধর্মের আগমনের ফলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বদল ঘটেছিল কোনয়াক জীবনযাত্রায়। শিয়াংহাচিংন্যুর এক কৃষক কাইথেই কোনয়াক স্মৃতি হাতড়ে বললেন পুরনো দিনের চিকিৎসা পদ্ধতির কথা। তখন কোনয়াক সমাজে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই জনগোষ্ঠীরই কোনও বদ্যির কাছে নিয়ে যাওয়া হত। তাঁর কথায়, “আমরা ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে যেতাম না, আমাদের গোষ্ঠীতেই বদ্যি ছিল।”
ব্যাপ্টিস্ট মিশন আসার পর তৈরি হল এক নতুন শ্রেণি – শিক্ষিত যুব সমাজ। তাঁরাই ১৯৪৬ সালে স্থাপন করলেন কোনয়াক ছাত্র ইউনিয়ন। স্থির হল সামাজিক এবং ধর্মীয় কাজ করতে হবে। যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্কির বিরুদ্ধে বেশ কড়া অবস্থান নিয়েছিল এই ইউনিয়ন। ১৯৬০ সালে উল্কি বন্ধ করার জন্য একটি প্রস্তাবও পাশ করা হয়েছিল। ফেজিন কোনয়াক তাঁর বই দ্য কোনয়াকস: লাস্ট অফ দ্য ট্যাট্যুড হেডহান্টারস-এ লিখছেন যে উল্কি করা এবং জীবজগতের উপাসনা – দুই রীতিকেই বিধর্মী বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

Swadesha Sharma

Sarbajaya Bhattacharya

Swadesha Sharma

Sarbajaya Bhattacharya
আমোর মতে আজকাল তাঁদের জনগোষ্ঠীর যুবক-যুবতীরা উল্কি করলে খুঁজে নেন আধুনিক বা কেতাদুরস্ত নকশা। সোশ্যাল মিডিয়া, দুনিয়ার ট্রেন্ড বা ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী উল্কি করান। তার সঙ্গে সাবেকি নকশা বা পদ্ধতির কোনও সম্পর্ক নেই।
কোনয়াক উল্কি এখন শুধু থেকে গেছে এই জনজাতির বয়স্ক মানুষদের শরীরে। উল্কির পদ্ধতি এখনও বেঁচে আছে আরহেন আর ননফের মতো মানুষের মনে, যাঁরা ছোটোবেলায় এই কাজ শিখেছিলেন। আর বেঁচে আছে তাঁদের গানে, যে গানে থাকে বেদনাদায়ক উল্কি করানোর পর রাজকন্যাদের জন্য একটু জিরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ।
এই প্রতিবেদন রচানার কাজে সাহায্যের জন্য স্যার পেইওয়াং ওয়াংসা কোনয়াক, পাংনেই ডাব্লিউ কোনয়াক এবং লেমনেই কোনয়াকের প্রতি লেখকের অশেষ কৃতজ্ঞতা
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/konyak-tattoos-maps-of-memory-bn