কাঠগোলাপের (প্লুমেরিয়া রুবরা) দুধসাদা আর হলদে বরণ সুগন্ধি ফুলগুলোকে লম্বা এক মালায় সযত্নে গেঁথে রাখছেন চন্দ্রমা। নাকে তাঁর কারুকাজ করা সোনালি নাকছাবি – একটা-দুটো নয়, তিন-তিনখানা! জেল্লায় তারা অনায়াসে টেক্কা দেয় এই এপ্রিল-বিকেলের কুসুম রঙা সূর্য আর তাঁর হাতের কাঠগোলাপগুলোর মধ্যিখানের গাঢ় হলুদকে। ওড়িশার কোরাপুট জেলার পুতপুন্ডি গাঁয়ের ঠিক বাইরে একটা খোলা জায়গায় বসে মালা গাঁথতে ব্যস্ত চন্দ্রমা আর তাঁদের গদবা আদিবাসী গোষ্ঠীর আরও জনাকুড়ি মেয়ে। তাঁদের সকলেরই নাকে দু-তিনটে করে নাকছাবি।
"ডানদিকের নাকেরটা হল বেসরি, মাঝখানেরটা দোন্দি আর বাঁদিকে যেটা দেখছ, ওইটেকে বলে নাত্তো। সারাজীবন ধরেই পরছি এগুলো। এসব গয়নাপাতি নাকে নিয়েই জন্মেছিলাম বোধহয়," খিলখিলিয়ে হেসে ওঠেন বছর সত্তরের চন্দ্রমা গদবা। হাসতে হাসতে দোন্দিখানা একটু ওপরে উঠে যায়, নাকের মাঝবরাবর ঝুলন্ত সোনার নোলকে অন্যসময় ঢাকা পড়ে থাকা নিচের ঠোঁটটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
"আগে আমাদের গদবা সমাজে, এক্কেবারে এতটুকু থাকতে বাচ্চা মেয়েদের তিনটে নাকছাবিই পরিয়ে দেওয়া হত। এখন অবশ্য একটু পরে নাক ফোঁড়ানো হয় – ওই পাঁচ বা দশ বছর বয়স হওয়ার পর। কখনও তো আবার বাচ্চা মেয়েরা নাক মোটে ফোঁড়াতেই চায় না," বলেন তিনি। কথা চলে, তাঁর দক্ষ আঙুলগুলোও চলে সমান তালে আর একমুঠো করে সদ্য-তোলা ফুল গাঁথা হয়ে যায় মালায়। সন্ধেবেলায় পুরুষেরা যখন শিকার অভিযান সেরে ফিরবেন, এ মালা দিয়েই তো বরণ করে নেওয়া হবে তাঁদের। চৈত পরবের (চৈত্র পরব বলেও পরিচিত) দিন বলে কথা!
ওড়িশা আর ঝাড়খণ্ড জুড়ে বহু আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যেই চোদ্দ দিন ধরে এই কৃষি-উৎসব পালনের চল আছে। হিন্দু বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস চৈত্রের শুরু হয় চৈত পরব দিয়ে। এই পরব যখন হয় অর্থাৎ সেই মাঝ-এপ্রিলের সময়টা কিন্তু সাবেক রেওয়াজমাফিকও খেতের কাজ থেকে বিরাম নেওয়ার সময়। আকাশ-বাতাস জুড়ে তখন গ্রীষ্মের গান, গাছ উপচে মরসুমি ফল-ফুলের সমারোহ। গদবাদের বাচ্চা-বুড়ো সব বয়সের মেয়েরাই তখন নাচে-গায়, খানাপিনা করে, গাঁয়ের দেবদেবীর থানে কাঁচা আম চড়ায় আর শিকার অভিযান সেরে ছেলেরা ফিরলে তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মালা গেঁথে রাখে।








