ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকারসূত্রে, ভারতের ক্ষুদ্রতম রাজ্য এই গোয়ায় খনিজ উত্তোলন সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে হয় — মোট রাজ্যের প্রায় দশ শতাংশ। বিচোলিম, সাতারি আর সাঙ্গুয়েম তালুকে মূলত লৌহ আকরিকের খনি। চিনই যেহেতু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বাজার (৮৬ শতাংশ রপ্তানি), তাই সেখানে লৌহ আকরিকের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত ৭-৮ বছরে চাহিদা বেড়েছে এসব খনিতে। ২০০৮-০৯ সালে গোয়া ২০০৩-০৪-এর তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি আকরিক রপ্তানি করেছে, উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক চাহিদা যত বাড়ছে, ভারতীয় খনি কোম্পানিগুলো ব্রাজিল, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো আরও নানা দেশে ব্যবসা ছড়ানোর কথা ভাবছে আগামী দিনে।
একদিকে খনি-মালিকরা গুনে গুনে টাকা ব্যাংকে রাখছেন, গোয়ার শীর্ষ পাঁচটি খনি কোম্পানির (যারা ৭০ শতাংশেরও বেশি রপ্তানি ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে) মোট মুনাফা ৮,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে — অন্যদিকে মাটির কাছে বাস্তবটা সম্পূর্ণ উল্টো। শুধু রাজ্যের বৃহত্তম খনি কোম্পানির (সেসা গোয়া) মোট মুনাফাই ২,৭৯৮ কোটি টাকা, অথচ গোয়া রাজ্যের মোট রাজস্ব ২,৭০০ কোটি। খনিকে গোয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে ঢাক পেটানো হলেও রাজ্যের রাজস্বে খনির ভাগ টেনেটুনে এক শতাংশ।
শিল্পের বাইরেও শীর্ষ খনি কোম্পানিগুলোর রাজ্যের উপর গভীর প্রভাব। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্র নতুন খনি লিজে স্থগিতাদেশ জারির পর হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী তথা খনি মন্ত্রী দিগম্বর কামত, খনির সহায়ক পরিকাঠামো — যেমন, সুবিধেমতো রাস্তাঘাট ইত্যাদি তৈরির ওপর জোর দেন। যদিও পরিবেশগত প্রভাব কীভাবে কতটা হিসেব হবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। গত বাজেটে প্রস্তাবিত খনি বর্জ্যের উপর সবুজ সেস কার্যকর করতে ব্যর্থ হওয়ার পর চলতি বছর মার্চের বিধানসভা অধিবেশনে তাঁর সরকার বাজেটে একটি খনিজ উন্নয়ন তহবিল ঘোষণা করে। সূত্রের খবর, রাজ্যের খনি শিল্পের চাপেই নীতি এতটা আলগা করতে হয়েছে।
তার উপর, এ বছর ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় সরকার স্থগিতাদেশ জারি করে খনন কাজের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়ার ঠিক আগেই কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রক প্রায় ১০০টি নতুন খনি লিজ মঞ্জুর করে ফেলেছে। "১১০টি খনিতেই যদি এত ক্ষতি হয়, আরও ১০০টা ছাড়পত্র পেয়ে গেলে কী হবে একবার ভাবুন?" প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলনেতা মনোহর পারিকর।
শীর্ষ খনি কোম্পানিগুলোর অন্যতম ভিএম সালগাওকারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর শিবানন্দ সালগাওকার পাল্টা জানান, "এই ১০০টা লিজ এত তাড়াতাড়ি চালু হবে না। ছাড়পত্র পেতে সময় লাগে। চিনের বাড়াবাড়ি রকম চাহিদার জন্যই এত হুড়োহুড়ি লেগে গেছে। ২০১২ সালের মধ্যেই চাহিদায় ভাটা পড়বে, অস্ট্রেলিয়া আর ব্রাজিলের প্রকল্পগুলো পুরোদমে একবার চালু হোক। পরিকাঠামোয় আজকাল চাপ বেশি। পিপিপি মডেলে মাইনিং করিডর তৈরির পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। রাস্তায় এখন একটু যানজট হয়।"
কিন্তু একদিকে খনি-মালিকরা যখন মুনাফা লুটছেন, মাটিতে তখন শুধু ধ্বংসের ছবি — শুকিয়ে যাওয়া ধানখেত, কমে আসা ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ও বন, ঘর-ছাড়া বন্যপ্রাণী, রোগভোগ — চলতেই থাকে।
তায় দোসর হয়েছে বেআইনি খনির সমস্যা, যা আজকাল রাজ্য সরকারও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। ২০০৫-০৬ সালের অর্থনৈতিক জরিপে বলা হয়েছিল, প্রায় ২,৬৬,০০০ বর্গমিটার সরকারি জমি খনি কোম্পানিগুলো 'বেআইনিভাবে দখল' করে নিয়েছে। ভারতের মোট লৌহ আকরিকের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে এই রাজ্য থেকে, যেখানে প্রায় ১১০টি লোহা ও ম্যাঙ্গানিজ খনি বছরে ৩ কোটি ৫০ লক্ষ টন আকরিক রপ্তানি করে। পারিকরের মতে, ২০০৭-০৮ সালে গোয়ার আকরিক রপ্তানি উৎপাদনের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল, যা ২০০৮-০৯ সালে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়েছে। "উৎপাদনের চেয়ে বেশি রপ্তানি কীভাবে হয়? স্পষ্টতই রাজ্যে ব্যাপক বেআইনি খনি চলছে," বলছেন তিনি।
এমনকি রাজ্যের পরিবেশমন্ত্রী আলেইক্সো সেকুয়েইরা মার্চে বিধানসভায় জানান, ৯৯টি খনি পরিচালকের মধ্যে ৮৫টি — যাদের মধ্যে সেসা গোয়া, সালগাওকার, চৌগুলে ও সোসিয়েদাদ ফোমেন্তোর মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিরাও পড়ে — বাধ্যতামূলক বায়ু দূষণ ছাড়পত্র ছাড়াই এ রাজ্যে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুমতির মেয়াদ ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০০৯ সালটা গোয়ায় 'খনি ক্ষ্যাপামির বছর' হয়ে উঠেছিল। এদিকে সেই বছরই রাজ্যের বন বিভাগ বনাঞ্চলে বেআইনি খনির বিরুদ্ধে জমা পড়া ৪০টিরও বেশি অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বাধ্য হয়। কিন্তু প্রায় কোনওটারই নিষ্পত্তি করে উঠতে পারেনি। শীর্ষ এক খনি কোম্পানির উচ্চপদস্থ আধিকারিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, "যাদের আইনি লিজ নেই এমন কত কোম্পানির বেআইনি খনিগুলো রমরমিয়ে চলত।" আবার আইনি লিজধারীরাও যে নানা শর্ত-নিয়ম ভাঙে, তাও উঠে আসে তাঁর কথায়।
সালগাওকার অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। "কী অনিয়ম? এই কোম্পানিগুলো তো খনির কাজ বন্ধ রেখেছে, কারণ বিভিন্ন দপ্তরে তাদের নবীকরণের আবেদন আটকে আছে। আমার দুটো খনি ২০০৭ থেকে বন্ধ — সরকারের ছাড়পত্রের অপেক্ষায়।"
বনাঞ্চলে বেআইনি খনির তালিকায় আছে কোলাম্বের খোদিদাস খনি, তার লিজের মধ্যে একটি বেসরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল পড়ে। তবু বন সংক্রান্ত ছাড়পত্র নেই, অথচ খনির কাজ চলছে। বাসিন্দারা বলছেন, আকরিক পরিবহণের জন্য ৪০০ মিটার চওড়া রাস্তার অনুমতিও খনি-মালিকরা বন বিভাগ থেকে বাগিয়ে নিয়েছেন।
খানিকটা এমনই ঘটেছে পেরনেম তালুকের কোরগাও গ্রামে (এতকাল শুধু কৃষি ও উদ্যানপালনের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে) আগে কখনও এসব দেখা যায়নি। ২০০৮ সালে এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক তথা ওই জমির মালিক জীতেন্দ্র দেশপ্রভুর বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আনে সরকারি কর্তৃপক্ষ — দেখা যায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই "জলের উৎস বাড়ানোর" নামে একটি গর্ত বড়ো করা হয়েছে এবং আকরিকের চিহ্নযুক্ত খননস্থলের কাছে ৫-৬ টন আকরিক মজুত রাখা হয়েছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ রিপোর্টে বলেছিল মালিককে কারণ দেখানোর নোটিশ পাঠানোর কথা ভাবা হবে। একই তালুকের বাসিন্দা কিশোর নাইগাঁওকর বলছেন, এতকিছুর পরেও, "রাতে খনন চলছে। গ্রামবাসীরা প্রশ্ন করতে পারেন না কারণ এটা তাঁর নিজের জমি, কিন্তু খনন বেআইনি কারণ লিজ বা পঞ্চায়েতের অনুমতি কিছুই নেই।" পেরনেমের বিধায়ক দয়ানন্দ সোবতে আরও জানান, "সরকার বাহাদুর আশ্বাস দিয়েছিল যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কিছু হয়নি। আগে দিনে খোঁড়াখুঁড়ি হত, এখন সেটাই রাতে হচ্ছে।" এদিকে দেশপ্রভু অবশ্য স্বীকার করেন তাঁর খনি ইজারার ব্যাপারটা সরকারের কাছে আটকে আছে, কিন্তু নিজে তিনি খনন চালাচ্ছেন না বলেই দাবি করেন। "আমি চাষবাসের বিশেষজ্ঞ, খনি-মালিক নই। এখানে স্রেফ একটু নারকেল গাছ লাগাচ্ছি, গবাদি পশুগুলোর থেকে জমি আগলাচ্ছি। আর এমনিতেও এই জমি বন সংরক্ষণ আইনের আওতায় পড়ে না।"
লড়াইয়ের পথ
রাজ্যে বেআইনি ও মাত্রাতিরিক্ত খননকাজের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছে দিনের পর দিন। এপ্রিলে গোয়ার পদ্মজয়ীরা — কার্টুনশিল্পী মারিও মিরান্ডা, লেখক রবীন্দ্র কেলকর, সংগীতশিল্পী রেমো ফার্নান্ডেজ প্রমুখ — একজোট হয়ে বেহিসেবি খননকাজের বিরুদ্ধে আবেদনপত্রে সই করেছেন। আর গত তিন বছরে খনি-বলয় জুড়ে ৮-১০টি নতুন প্রতিবাদী দল গড়ে উঠেছে। সালগাওকার তীক্ষ্ণভাবে বলেন, "গোয়ার মানুষ খনির পক্ষে নেই। বলুন কোন কাজটা গোয়ার মানুষ সমর্থন করে? আন্দোলন করা অন্যায় নয়, কিন্তু জিনিসটা তো ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা। যারা খনির বিরোধিতা করছেন তারা কি খনিতে কর্মরতদের কাজ দিতে পারবেন? বেপরোয়া খনিওয়ালাদের থামানো উচিত। সবাইকে এক রঙে রাঙানো যায় না।"
কিন্তু যাঁরা এই লড়াইয়ে সামনের সারিতে আছেন, তাঁদের জন্য রাস্তাটা সহজ ছিল না।
সেবাস্তিয়ান রদ্রিগেজ: ব্লগার-আন্দোলনকর্মী এবং গাকুভেড-এর (গাওয়াড়া, কুনবি, ভেলিপ ও ধানগর ফেডারেশন) সমন্বয়কারী। ২০০৮ সালে খনির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অভিযোগ, স্থানীয় খনি মাফিয়ার হাতে মারও খেতে হয়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো তাঁকে নকশালপন্থী তকমা দেয়। নাট্যকর্মী হার্টম্যান ডি'সুজার স্ত্রী শেরিল ডি'সুজা, তাঁদের মেয়ে ও শেরিলের মা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন — ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে খনির জন্য নিজেদের জমি দিয়ে খনন প্রকল্পে মদত জোগাননি বলে। অন্যান্য আন্দোলনকর্মীদের সহায়তায় ট্রাকের সঙ্গে নিজেদের বেঁধে ফেলেছিল পরিবারটি। এরপর স্থানীয় মাফিয়া তাঁদের মারধোর করে ক্যামেরা ভেঙেচুরে দিলে প্রতিবাদ বিশ্রী চেহারা নেয় — পুলিশ স্রেফ দাঁড়িয়ে দেখে। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
রামা ভেলিপ: তাঁর বাড়ি ও ধানখেত খনির ইজারা নেওয়া জমিতে পড়েছিল। ১৯৯৩ সালে, আদালতে দেদার লড়ে-টড়ে একটা বেআইনি খনি বন্ধ করিয়েছিলেন রামা আর তাঁর বাবা। "খনি-মালিকরা আমাদের গ্রামের উর্বর মাটি অন্য জায়গায় বিক্রি করছিল," তিনি বলছেন। বাবা-ছেলে দুজনকেই গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছিল; মামলা চলেছিল তিন বছর। শেষে ফয়সালা হয় — তাঁর বাবা দাবি করেন গ্রামের মাটি গ্রামেই থাকবে।
পি. কে. মুখার্জি, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, সেসা গোয়া — প্রশ্নোত্তর
মার্চে বিধানসভায় দেখানো হয়েছে সেসা গোয়ার নিট মুনাফা ২,৭৯৮ কোটি টাকা — যা কিনা গোটা রাজ্যের রাজস্বের চেয়েও বেশি।
দেখুন, ২০০৮-০৯ সালে করের আগে আমরা ২,০০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছিলাম। একটা কোম্পানির মুনাফা এ ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক বুঝছি না। হয়তো প্রশ্নটা হল মানুষের কাছে কতটা ফিরে যাচ্ছে। বিতর্কে যেতে চাই না, সংখ্যা ও প্রসঙ্গের আলোচনা বরং থাক।
(১১০টা খনির কাজ ইতিমধ্যেই চলছে) আরও ১০০টা খনি লিজ অনুমোদন পেলে গোয়ার অর্থনীতি ও পরিবেশে কী প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?
বিষয়টা লিজের সংখ্যার নয়; যোগ্য লোক কতজন এই কাজ করছেন তার উপর নির্ভর করে প্রভাব আলাদা আলাদা হবে। উৎপাদন কত হচ্ছে, কত একর জমি আছে — এসব দেখতে হবে। গোয়ায় খনি লিজ ছড়ানো-ছিটানো; আকার-আয়তন, বিদ্যমান পরিকাঠামোর উপর চাপ সবকিছুর ওপরেই জিনিসটা নির্ভর করবে — পরিবেশগত ছাড়পত্রে জল, বর্জ্য ফেলার জমি ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। আইন যথেষ্ট শক্তিশালী, এখন কড়া হাতে সেসব প্রয়োগ হওয়া দরকার।
গত কয়েক বছরে রাজ্যে খনির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর চড়ছে কেন?
মূলত লৌহ আকরিককে কেন্দ্র করে এই প্রতিবাদ — এ পণ্য ঘিরে চর্চাও বেশি হচ্ছে এখন। একরকম অস্বাভাবিক মুনাফার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বেপরোয়া লোকেরা ঢুকে পড়ছে, সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ভারতে দেশি-আন্তর্জাতিক অনেক এনজিও এসে গেছে। খামোখা দোষ-গুণ বিচারে না গিয়েও বলা যায়, এই সংস্থাগুলোর একমাত্র কাজই হচ্ছে আন্দোলন।
গোয়ায় বেআইনি খনির নানা দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে, শীর্ষ এক খনি কোম্পানি বলেছে আইনি লিজধারীরাও জরুরি শর্ত মানেন না।
বেআইনি কাজকারবার কঠোর হাতে দমন করতে হবে। লিজধারীরা বেআইনি নন; তাঁদের লিজে পরিবেশগত অনুমোদন আছে। আইন প্রয়োগের জন্য চিৎকার করে লাভ নেই, শাস্তি দিতেই হবে। আমাদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত যথেষ্ট দক্ষ।
রাজ্যের পরিবেশমন্ত্রী গত সপ্তাহে বিধানসভায় নাম করে বলেছেন, ৯৯টা কোম্পানির মধ্যে যে ৮৫টা বায়ু দূষণ ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে তাদের মধ্যে সেসা গোয়াও পড়ে।
প্রতিটা লিজে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বায়ু ও জল আইনের অধীনে ২-৩ বছর অন্তর দূষণ ছাড়পত্র দেয়। আমরা নবীকরণের আবেদন করেছি, সরকারিভাবে এখনও এসে পৌঁছয়নি। প্রত্যাখ্যান করা না হলে বা কারণ দর্শানোর নোটিশ না পেলে সেটা রিনিউ হয়েছে বলেই ধরা হয়। এখনও ছাড়পত্র পাইনি ঠিকই, তবে বাতিলের নোটিশও তো আসেনি।
বেআইনি হোক বা না হোক — রাজ্যে খনির ধ্বংসলীলা অব্যাহত
আরও দক্ষিণে
কোলাম্বের বান্ধারায় চার সন্তানসহ আটজনের পরিবার নিয়ে থাকেন ৩৮ বছরের ডোমেন ডি'সুজা। বলছেন, গত ৪-৫ বছরে ধুলোর দূষণে বাচ্চাদের হাঁপানি, গলা ব্যথা হচ্ছে, ঘন ঘন ঠান্ডা লাগছে। গ্রামের আবাসিক চিকিৎসক ড. এ. প্রভুদেশাই জানান, দিনে গড়ে ২-৪টি শিশু শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে আসে। "নিউমোকোনিওসিস নামে একরকম রোগ আছে যেখানে অদ্রবণীয় ধুলো ফুসফুসে জমে যায়। এই সমস্যা মুম্বইয়ের মতো জায়গাতেও লেগেই থাকে, কিন্তু এখানে বাড়তি কারণ খনির ধুলো। গ্রামের বাচ্চারা এতে বিশেষভাবে ভোগে।" আরও সমস্যা আছে। "খনির জন্য ভেতরের বন কেটে ফেলা হচ্ছে, জ্বালানি কাঠ মেলা ভার। গরু চরার মতো ঘাসও বেঁচে নেই। খনির দালালরা মারামারি করে, ভয় দেখায়, গ্রামবাসীকে মদ খাওয়ায়... গ্রাম থেকে মেরেকেটে ৬-৮ জন খনিতে কাজ করে, বাকি ৩০ জনের মতো যারা নিরাপত্তা ও কাজের দায়িত্বে আছে, তারা বাইরের," বলছেন ডি'সুজা।
৪৫ বছরের মিলাগ্রিন আন্তাইও দশ বছর ম্যাঙ্গানিজ খনিতে কাজ করেছেন, দিনে ১০-১৫ টাকা রোজগার। ছয় বছর আগে যখন তাবড় এক কোম্পানি খনিটার মালিকানা পায় ও "কর্ণাটক থেকে যন্ত্রপাতি আর সস্তাদরে শ্রমিক" আনা হয়, মিলাগ্রিন ছেড়ে দেন কাজটা। "এখন ঝাড়খণ্ড থেকেও মজুর এসে পড়েছেন, ওদের ওখানে তো তদ্দিনে সব লুটেপুটে গিয়েছে,” আক্ষেপ ঝরে তাঁর কথায়।
এলাকায় বেআইনি খনি বিরোধিতার পুরোভাগে আছেন চল্লিশের কোঠার রামা ভেইলিপ। বলেন, ১৫১০ সংখ্যাটা তিনি ভুলতে পারবেন না — কোলাম্বের মোট ১,৯২৯ হেক্টর এলাকার মধ্যে ১,৫১০ হেক্টর খনির দখলে। আবার এই ১৫১০ সালেই পর্তুগিজরা ভারতে পা রেখেছিল। তাঁর কথায়, খনির কারণে ব্যাপক বন উজাড় হয়েছে, "তাই বৃষ্টির জল আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এক দশক আগে ৩৫০ ইঞ্চি বৃষ্টি হতো, এখন কোনও মতে ১০০ ইঞ্চি পাই। গত জুনে একটুও জল ছিল না। গাছ না থাকলে মাথা বাঁচবে কেমন করে? ২০০৬ থেকে ২০১০-এর মধ্যে প্রায় ৩০ হেক্টর বন কাটা পড়েছে। বাঘ উধাও হয়ে গেছে। খনি অনেক গভীরে নেমে গেছে, খাবার জল পাই না। জল না থাকলে কিচ্ছুটি থাকে না।"
প্রায় ৮০টি পরিবার এই খনিগুলোর আশেপাশে বাস করে, সবচেয়ে কাছের পরিবারগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। গত বছর চারটি পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয়, ক্ষতিপূরণ মিলেছে ২ থেকে ৭ লক্ষ টাকার মধ্যে। "এখন মানুষের মন পেতে খনি-মালিকরা গ্রামের শান্তাদুর্গা মন্দিরটা পাকা করবে বলে কোটি টাকা খরচ করেছে," বলছেন ভেলিপ। "তার সঙ্গে আবার বাচ্চাদের নিখরচায় ছাতা, ব্যাগ, বই এইসব দিচ্ছে, অথচ মানুষ খনির ধুলো খাচ্ছে, দূষিত জল পান করছে।"
গোয়ার মানুষ ও অধুনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা খনিবিরোধী আন্দোলনকর্মী কার্মেন মিরান্ডার মতে কোলাম্বে স্থানীয় কৃষকদের জমি ও সরকারি বন খনির জন্য হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে মনে হচ্ছে। "কিন্তু পুরো বিষয়টা এমনই অদ্ভুত, স্থানীয় মানুষ মনে করছেন সব গিলতে বসা খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে একটা হারা-লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন তাঁরা।"
উত্তরের হালহকিকত
উত্তর গোয়ার সাতারি তালুকের পিসুর্লেমের বান্দওয়াড়ায় ঠাঁইনাড়া হতে চলছে প্রায় ৩৭ টা পরিবার, নিজেদের পূর্বজদের ভিটেয় এই তাঁদের শেষ মরসুম। ২০১০ সালের মে মাস এলেই শান্তিনগরে চলে যেতে হবে। যে জমিতে তাঁদের সাবেক বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেখানটা খুঁড়লে নাকি আরও আকরিক মিলবে, তাই এই বন্দোবস্ত। এই গ্রামে হাজার চারেক মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য ভরসা করে থাকেন ৮০ একর জমির উপর, তার চারদিকে বহু বছর ধরে চলা খনির বেষ্টনী।
৪৫ বছরের গুরুদাস লক্ষ্মণ গাওড়ে এককালে খেতিবাড়ি করতেন, তিন বছর হল একটা খনির কাছে মরসুমি চায়ের দোকান (নভেম্বর-মে) চালাচ্ছেন। নতুন ঠিকানার বাসিন্দাদের দলে রয়েছেন তিনিও, দেওয়া হয়েছে ৬ লক্ষ টাকা। "এই মাটিতে জন্মেছি, বড়ো হয়েছি। কিন্তু বাকি সবাই যেহেতু যাচ্ছে, তাই আমাকেও সব ছেড়েছুড়ে চলে যেতে হবে। যবে থেকে ঝোরাগুলো শুকোতে শুরু করল, ধানের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হলাম – সেও আজ দশ বছর আগের কথা। চায়ের দোকানের বেলায় তো ব্যাপারটা আলাদা," বলছেন তিনি। এই গ্রামে বাড়ি বদল নতুন কিছু নয়। ৬০ বছরের সীতারামা সাভাইকারও এই মে মাসে পরিবার নিয়ে চলে যাচ্ছেন। একটি খনিতে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্বে থাকা তাঁর ছেলে জানান, আগে যেখানে থাকতেন সেখানকার মাটিতে ফাটল ধরেছে। "যেকোনও সময় ধস নামতে পারে, আর এই গ্রামের নিচে আকরিক থাকায় খনি এদিকে বাড়ছে।"
পরিবারগুলোকে সরানোর নেপথ্যে দামোদর মঙ্গলজি নামে যে খনি কোম্পানি রয়েছে, তার মুখপাত্র হরিশ ডি. রাজানি প্রথমে এই নিয়ে কথা বলতে রাজি ছিলেন না — তাঁদের "প্রচেষ্টার" জন্য "প্রচার" চান না বলে। পরে বললেন এটা তাঁদের "কর্তব্য"। আর এইযে মানুষকে চাষবাসের মতো সাবেক জীবন-জীবিকা হারাতে হচ্ছে সে প্রসঙ্গ উঠলে, দাবি করলেন সেখানকার প্রত্যেক গ্রামবাসী খনি কোম্পানিতে কাজ পেয়েছেন। "আমাদের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র আছে। তাছাড়া প্রাচীর ও অন্যান্য নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছি।"
কৃষির পাশাপাশি এখানে দুধের ব্যবসাও ধাক্কা খেয়েছে। আট বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে যোগেশ্বরী দুধউৎপাদক সংস্থা। ৫৫ বছরের তারাবাই আবাসাহেব দেশাইয়ের দশ বছর আগে ৪০টা গরু ছিল, এখন ১০টায় এসে ঠেকেছে। "দুধ ২৫ লিটার থেকে ২ লিটারে নেমে এসেছে। গরুর ঘাস, জাব, জল – টান পড়েছে সবেতেই। আমাদের বাড়ির কাছে একটা ঝোরা ছিল, তাও শুকিয়ে কাঠ। এখন ট্যাঙ্কারে জল আসে," তিনি বলছেন।
দীর্ঘদিনের আন্দোলনকর্মী হনুমন্ত পরাবের মনে পড়ে শুকিয়ে যাওয়া পান্দিকাটচি তাল্লির কথা — এলাকার এই জলাশয় এক দশক আগেও ৮০ একর জমিতে সেচের জল জোগাত। "এখন খনির পলিতে বুজে গেছে। এলাকার বেশিরভাগ ঝরনা শুকিয়ে কাঠ। বিজ্ঞান বলে, ধ্বংস হওয়া গ্রামীণ সম্পদ আর ফেরানো যায় না। কাজু, বাবলা আর নারকেল গাছ কাটা পড়েছে। সব খনি বর্জ্য সরকারি মালিকানাধীন পাহাড়টায় ফেলা হচ্ছে। তার উচ্চতা হওয়ার কথা ৬০ মিটার, কিন্তু ১৫০-২০০ মিটার পর্যন্ত উঠে গেছে। বাঘের জন্য বিখ্যাত ভাঘুরে গ্রামে বিস্ফোরণ শুরু হওয়ার পর থেকে বাঘ উধাও।"
গ্রামের ভেতর দিয়ে একবার গেলেই দুর্দশাটা চোখে পড়ে। গভীরভাবে কাটা পাহাড়ের ঢাল, কয়েক মিনিট পরপরই আকরিক বা বর্জ্য বোঝাই ট্রাকের ঘর্ঘর শব্দ, শুকনো লাল ধুলোয় নুয়ে পড়া গাছপালা, শুকিয়ে যাওয়া কুয়োর জায়গায় বিবর্ণ নীল জলের ড্রাম…
পরাব বলেন, "পুরনো খনিগুলো গ্রামটাকে ইতিমধ্যেই শেষ করে দিয়েছে। নতুন খনি হলে গ্রামটা শুধু মানচিত্রে টিকে থাকবে। তিন কিলোমিটার ব্যাসার্ধের খনির প্রভাব পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত পড়ে। ২০০০ সালে খনির কারণে বন্যাও হয়েছিল। নতুন খনি চাই না — লাভ হয় অন্যের, মাশুল গোনে গ্রামটা। পনেরো বছর পর যখন আকরিক ফুরিয়ে যাবে, গ্রামের কী হবে?"
জয়রাম রমেশ, তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী — সাক্ষাৎকার
'বন বিভাগ আর খনি লবির যোগাযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই'
সবার মনে যে প্রশ্নটা ঘুরছে এখন — পৃথিবী কি সত্যিই গরম হয়ে উঠছে? কী মনে হয় আপনার?
অভিজ্ঞতার নিরিখে কথাটা সত্যি বলেই মনে হয়। এবার আমরা তো সবাই শখের বিজ্ঞানী, যখনই তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়, আমরা সবাই ভাবি নিশ্চয়ই তাই। কিন্তু পৃথিবী গরম হচ্ছে — এমন কোনও অকাট্য প্রমাণ কি আছে? হ্যাঁ এখন নাসার জেমস হ্যানসেনের মতো দায়িত্বশীল বিজ্ঞানী সর্বসমক্ষে বলেছেন পৃথিবী গরম হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন নিশ্চিতভাবে অনিয়মিত হয়ে গেছে — এই যেমন চেরাপুঞ্জিতে গেলেই মানুষ বলে আগের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি হচ্ছে। তাহলে হয়তো পৃথিবী সত্যিই গরম হচ্ছে।
খনির কথায় আসা যাক। এলোপাথাড়ি ও বেআইনি খনির ঘটনা একের পর এক সামনে আসছে — সমস্যাটা রীতিমতো গুরুতর হয়ে উঠেছে এখন। আপনার মন্ত্রকের এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া কি?
দেখুন, আমরা দেশের এমন বেশ কিছু অঞ্চল চিহ্নিত করেছি যেখানে খনন স্পষ্টতই জায়গাটার সহ্যসীমা পার করতে চলেছে। গোয়া তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ — এখানে ভবিষ্যৎ খনিতে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমঘাটও এইরকম একটা জায়গা, ওখানে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছি আমাদের অন্যতম সেরা বাস্তুতন্ত্রবিদ মাধব গ্যাডগিলের নেতৃত্বে — পশ্চিমঘাটের সংকটাপন্ন এলাকাগুলো চিহ্নিত করছেন তিনি। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ খনি প্রকল্প স্থগিত রাখা হয়েছে — এই যেমন বেদান্ত প্রকল্প নিয়ে তো এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আমরা অনেক সাবধান হয়েছি এখন। কয়লা খনির বেশ কিছু প্রকল্প আটকে দিয়েছি। কোন কোন অঞ্চলে ঢোকা যাবে (গো এরিয়া) আর কোনখানে ঢোকা যাবে না (নো-গো এরিয়া) সেসব আলাদা করা হচ্ছে, বিশেষত ছত্তিশগড়ে ‘নো-গো’ এলাকায় কয়লা খনির প্রস্তাব বাতিল করেছি। কিন্তু দেখুন সাফ কথা, খনি করতেই হবে। খনির কাজ থামানো যাবে না। কিন্তু বেআইনি খনি বন্ধ করতে হবে। আমরা খুব কড়া ব্যবস্থা নিয়েছি। আমি যেমন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি, ওখানে অনেক বেআইনি খনন হয়েছে তো। কর্ণাটকের বেশ কিছু খনি ইজারা বাতিলও করা হয়েছে। খনির কাজ চালাতেই হবে, আইন মেনে খনি চলবেই। কিন্তু এমনকি আইনি হলেও যখন ঘন জঙ্গলে খোঁড়ার প্রসঙ্গ আসে, আমরা আরও একবার ভেবেচিন্তে দেখি, এই কয়লার ক্ষেত্রেই যেমন। বেশ ধাঁধা গোছের ব্যাপার বুঝলেন! কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে এখনও বাস্তুতান্ত্রিকভাবে টেকসই খনন হয় না…
খনির কোনও টেকসই পথ আছে?
হ্যাঁ, তা আছে। জার্মানরা করেছে, আমেরিকানরাও করেছে। ভারতেও নেইভেলি লিগনাইট দীর্ঘস্থায়ী খনির ভালো উদাহরণ। অন্ধ্রপ্রদেশের সিঙ্গারেনিও তাই। আমরা আরও সংবেদনশীল হলে পথ ঠিকই বের হবে। তবে জনজাতি অঞ্চলে খনির ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধান থাকতে হবে — খনির সুফল আসলে কারা পাচ্ছে এইসব বিভিন্ন বিষয়-সমস্যা খতিয়ে দেখতে হবে সেখানে।
কর্ণাটকে রেড্ডি ভাইদের কিংবা ঝাড়খণ্ডে মধু কোড়ার মতো খনি কেলেঙ্কারি নিয়ে কী বলবেন?
কেলেঙ্কারি নিয়ে আমার করার কিছু নেই। আমি শুধু আইন প্রয়োগ করতে পারি — পরিবেশ সুরক্ষা আইন, বন সংরক্ষণ আইন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন। এই তিনটেই শুধু হাতিয়ার আছে আমার। বললেই তো আর মধু কোড়াকে ধাওয়া করতে পারি না। এই আইনগুলোর একটাও যদি তিনি ভেঙে থাকেন, তবেই ব্যবস্থা নিতে পারব।
আচ্ছা তাহলে রাজ্যের বন বিভাগ যখন এখানকার খনি লবির সঙ্গে হাত মেলায়, মন্ত্রক সেটা কীভাবে দেখে?
দেখুন, যোগসাজশের কথাটা অস্বীকার করব না। ওড়িশা হোক, ঝাড়খণ্ড হোক, মধ্যপ্রদেশ হোক — যেকোনও রাজ্যেই এটা আছে। তবে মনে রাখতে হবে রাজ্য সরকারগুলোও বিনিয়োগের ফল দেখানোর চাপে থাকে। মুখ্যমন্ত্রীরা বেসরকারি বিনিয়োগ চান, দেখাতে চান তাঁদের অর্থনীতি দিব্যি চলছে।
গোয়ার ক্ষেত্রে, সম্প্রতি দুটি অনুমোদিত প্রকল্প আপনার মন্ত্রক বাতিল করেছে আর গোয়ার বন বিভাগ যে এখানকার খনি লবির গলাগলি দোসর — এমন প্রমাণ যথেষ্ট আছে। মন্ত্রক এটা কীভাবে দেখছে?
কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কী ধরনের কঠোর ব্যবস্থা?
খনিতে স্থগিতাদেশ দিয়েছি, প্রকল্প বাতিল করছি — আর কী চান?
এই আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে না?
এখানে একটা সূক্ষ্ম সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। আমি শুধু বিষয়টা রাজ্য সরকারের নজরে আনতে পারি। তাদের নিজের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তাদেরকেই নিতে হবে। যদি আমাদের বনবিভাগে, প্রাদেশিক দপ্তরগুলোয় এরকম অফিসাররা থাকেন, আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি।
বন বিভাগ যখন নির্দিষ্ট এলাকায় বাঘের অস্তিত্বই বেমালুম অস্বীকার করে, শুধু এই কারণে যে বাফার জোন হলে খনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? এই ধরুন গোয়াতেই যেমনটা হল।
হ্যাঁ, মহারাষ্ট্রও তাড়োবার চারপাশে বাফার জোন ঘোষণায় অনেক দেরি করছে। চিরকাল রাজ্য সরকারগুলো বাফার জোন ঘোষণায় গড়িমসি করেছে কারণ তাতে খনির কাজকর্মে বাধা পড়বে। কিন্তু মহারাষ্ট্রে তাড়োবা বাফার জোনে কয়লা খনির প্রস্তাব কিন্তু আমি বাতিলও করেছি। আমার কিন্তু মনে হয় মন্ত্রক থেকে যথেষ্ট কড়া বার্তা গেছে। কিন্তু খনির কাজ বা অর্থনৈতিক কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়াটা তো লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য হচ্ছে খনির নিয়মকানুনের দিকটা দেখা এবং পরিবেশ মন্ত্রকের তিনটি আইন ভেঙে যেন খননকাজ না হয় সেইটা নিশ্চিত করা।
তাহলে অবৈধ খনন আটকানোর বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?
ঔবালাপুরমে বেনিয়মের অভিযোগ ছিল, আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। সমীক্ষা করতে বলেছি। সুপ্রিম কোর্টও হস্তক্ষেপ করছে ব্যাপারটায়। কর্ণাটকে অনেক বেআইনি খনির অভিযোগ ছিল বলে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি। বন সংরক্ষণ আইন অমান্য করলে ওদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি আমরা।
অরুণাচল প্রদেশে এই যে বাঁধগুলো তৈরি হচ্ছে, সে প্রসঙ্গে আসি।
দেখুন একই নদীর ওপর আপনি এক গুচ্ছ প্রকল্প করতে পারেন কিন্তু আমরা জানি প্রকল্প অনুযায়ী মূল্যায়নে কাজের কাজ কিছু হবে না। সুতরাং নদীর ধারণক্ষমতাটা তো আগে দেখতেই হবে। আমরা উত্তর তিস্তার জন্য এইটা করেছি, পাঁচটা প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছি। একইভাবে ভাগীরথীর ওপর প্রকল্পগুলো থামিয়ে দেওয়ার সুপারিশও করেছি আমরা, কারণ এরকম গুরুত্বপূর্ণ নদীতে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহটা (নদীতে যে পরিমাণ প্রবাহ থাকলে বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকে) থাকা দরকার। বাঁধনির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ভাবনা ছিল না। উন্নয়ন আর পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্যটা দেখে যে কাজ করা দরকার এইটেই বলতে চেয়েছিলাম। আর যেখানে এরকম প্রকল্প জরুরি, সেখানে বাস্তুতান্ত্রিক দিক থেকে টেকসই পদ্ধতি নিতে হবে।
খনির জন্য বন ছাড়পত্র দরকার। মন্ত্রক এটা কীভাবে দেখে? গোয়ার মাঠে-ময়দানে মানুষকে বলতে শুনছি, ঠিকঠাক লিজ ছাড়াও জায়গায় জায়গায় খনি চলছে।
তাহলে রাজ্য সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি শুধু বলতে পারি বন ছাড়পত্র আইনের অধীনে কোনও প্রকল্প অনুমোদন পেলে তা বেআইনি নয়। বেআইনি সেটাই যেখানে অনুমতি নেই। শুরুটা করবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ — রাজ্য সরকারকে সেখানে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি সারাক্ষণ পুলিশি চালাতে পারব না, সহযোগী হতে পারি। আইনকানুন তো সব কেন্দ্রের, ব্যবস্থাপনা স্থানীয়ভাবে না হলে চলবে কেন!
আইনগুলো বলবৎ কীভাবে করা যাবে?
রাজ্য সরকারকেই বলবৎ করার দায়িত্ব নিতে হবে। শাসনযন্ত্র তো তাদের হাতেই আছে।
কোনওভাবে নিয়মভঙ্গের ঘটনা ঘটলে মন্ত্রক কীভাবে সামাল দেবে?
কেউ যদি নিয়ম ভাঙে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। বেদান্তর বেলাতেও আমরা একটা দল পাঠিয়েছিলাম, তারা একটা রিপোর্ট দিয়েছিল, আমরা সেটা খতিয়ে দেখছি। যখন এরকম নিয়মভঙ্গের রিপোর্ট আসে, আমাদের নিজেদের তো গিয়ে যাচাই করার মতো সুযোগ-সুবিধে থাকে না। আমরা এক একটা দল পাঠাই ঐজন্য। এমনি করে কেরালা কিংবা বেদান্তর জন্য গোয়া আর কর্ণাটকেও দল পাঠিয়েছি আমি।
এতগুলো বছর ধরে ভারতের উপকূলরেখা বরাবর কোস্টাল রেগুলেশন জোন (সিআরজেড) বিষয়টা কীভাবে বিচার-বিবেচনা করা হয়েছে?
আমাদের ১৯৯১ সালের একটা সিআরজেড আছে, তার আবার সংশোধন হয়েছে ২৫টা। আমরা এখন ২০১০ সালের সিআরজেড খসড়া করছি, তাতে সিআরজেড ১৯৯১ এর অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা যে সিআরজেড ৯১-এর ক্ষমতা কমিয়ে দিতে চাইছি তা কিন্তু নয়। সিআরজেড ২০১০ নিয়ে আসা হচ্ছে যাতে ৯১-এর সিআরজেডকে আরও শক্তিশালী করা যায় আর বিশেষভাবে কাজকর্ম চালানোর জন্য ভারতের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা যায়। এই যেমন, গোয়া, কেরালা, মুম্বই, আন্দামান, লাক্ষাদ্বীপ। একটা বিশাল সিআরজেড থাকলেই তো হবে না, বাস্তুতান্ত্রিকভাবে বিশিষ্ট এই প্রত্যেকটা এলাকার জন্য বিশেষ বিশেষ কার্যপ্রণালী লাগবে। খসড়াটা সর্বসমক্ষেই দেখানো হবে; গোয়া, মুম্বাই, কোচিন, পুরি আর চেন্নাইয়ের আমজনতা আর মৎস্যজীবীদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই পাঁচটা জনসভা সেরে ফেলেছি আমি।
ভারতের খনি-বিধি গুলোতে আইনের বাঁধন তেমন নেই। কিন্তু সরকার চাইলে কিছু কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কেলেঙ্কারিগুলো নিয়ে সরকারের কি মত?
এসব কেলেঙ্কারি নিয়ে আমার কিছু করার নেই, আমার ক্ষমতা বাঁধা। আমায় শুধু নিশ্চিত করতে হবে আইন যাতে না ভাঙা হয়। আপনি খনি আর রাজনীতির আঁতাত নিয়ে আরও বড়ো মাপের প্রশ্ন করছেন। ওর মধ্যে ঢুকতে পারব না, অত খোঁজখবর জানা নেই।
কিন্তু খনি ইজারায় ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যাপারে পরিবেশ মন্ত্রক তো একটা বড়ো ভূমিকা নেয়…
ওই তিনটে আইন যাতে মানা হয় সেইটা দেখাই শুধু পরিবেশ মন্ত্রকের দায়িত্ব। দুর্নীতি আইন, কালো টাকা সাদা করার অপচেষ্টা — এসবের মধ্যে আমরা নাক গলাই না। এগুলো আমাদের নির্দেশিকায় নেই। আমরা শুধু দেখি আমাদের ত্রিফলা আইনটা আক্ষরিক আর মর্মার্থে প্রয়োগ হচ্ছে কি না।
পরিবেশ মন্ত্রক তাহলে কী ধরনের উন্নয়নের বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা করছে?
যে কোনও প্রকল্পের বেলাতেই আমার তিন রকম প্রতিক্রিয়া থাকবে – প্রথমটা হচ্ছে হ্যাঁ, দ্বিতীয়টাও হ্যাঁ, তিন নম্বরটা না। শুধু ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ বলে চলাটা মন্ত্রকের কাজ নয়। তাই বলে কেবল ‘না না’ মন্ত্রক হলেও চলে না। মন্ত্রকের কাজ খুঁটিনাটিগুলো বোঝা। খুঁটিনাটি অর্থাৎ এই যে – আজকাল একগুচ্ছ প্রকল্প ‘হ্যাঁ’ বর্গের মধ্যে পড়ে, বেশ কিছু থাকে ‘হ্যাঁ, কিন্তু…’-র আওতায়, কয়েকটা থাকে ‘না’ বর্গভুক্ত। এই ‘না’-গুলো নিয়েই শুধু শিরোনাম বানিয়ে ফেলা হয়, সংবাদমাধ্যম দুই মন্ত্রকের ঠোকাঠুকি দেখাতে ব্যস্ত। আসল কথা হচ্ছে পরিবেশের কথা বিচার করে এই মন্ত্রক ৯৫ শতাংশ প্রকল্পকে ছাড়পত্র দেয়, ৮৫ শতাংশের বেশি ছাড়পত্র দেয় জঙ্গলের কথা বিচার করে…
তাহলে কিছু প্রকল্প স্বাভাবিকের চাইতে অনেক তাড়াতাড়ি ছাড়পত্র পায় কী করে?
প্রকল্প নিয়ে টানাহেঁচড়া তো চলতেই থাকে। এখন গোটা ব্যবস্থাটা কিন্তু স্বচ্ছ। আমি স্বার্থ-সংঘাতের কোনও গল্পই রাখিনি। পরিবেশ মূল্যায়ন কমিটিগুলোর চেয়ারম্যানদের সব বদলে দিয়েছি। এখন ঝুলে থাকা প্রতিটা প্রকল্প নিয়ে যাবতীয় তথ্য ওয়েবসাইটে পেয়ে যাবেন। আমরা ব্যাপারটা যথাসম্ভব ব্যবসার মতো করার চেষ্টায় আছি।
বেআইনি খনি প্রকল্পগুলো আটকানোর কোনও পরিকল্পনা আছে?
আমরা আরও সাবধান হব…
রাজ্যে বন দপ্তর আইনভঙ্গ করলে কীভাবে সামলানো হয় বিষয়টা?
সাধ্য কতটুকু না জেনেবুঝে প্রকল্পে ছাড় দিই না, আইন ভাঙলে ব্যবস্থা তো নেবই। ভালো করে দেখুন। জঙ্গল বিষয়ে পরামর্শদাতা সমিতির সুপারিশ করা অনেক প্রকল্পই আমি নাকচ করে দিয়েছি। আমরা আরও পড়াশোনা করার কথা ভাবছি। দেখুন সব তো ওপর থেকেই শুরু হয়; আমাকেই ঠিকঠাক সংকেত দিতে হবে।
টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা কী বলবেন?
কোনও জাদুমন্ত্র তো নেই। তিনটে মিলিয়েই ভারসাম্য খুঁজতে হবে, আদর্শ একটা মধ্যপন্থা বের করতে হবে। গোঁড়ামি চলবে না — উন্নয়ন চাই, প্রকল্প চাই, তাতে কর্মসংস্থান হয়।
ভারত নিজের বনাঞ্চল বাড়াতে চাইছে অথচ এলোপাথাড়ি খনন কাজও চলছে। এই দুটোকে কীভাবে মেলাবেন?
আমরা বিশেষত ন’টা বড়ো কয়লাক্ষেত্রে কয়লা খনির কাজে গো ও নো-গো এলাকা (প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত) চিহ্নিত করেছি। প্রায় ৩৫ শতাংশ কয়লা ব্লক নো-গো এলাকায়, যেখানে ঘন গাছপালা ও বনাঞ্চল আছে। লৌহ আকরিকের ক্ষেত্রে এখনও এটা করা হয়নি। কয়লার ব্যাপারটা গুরুতর কারণ আগামী ৭-৮ বছরে উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। বাড়তি কয়লা আসবে বনাঞ্চল থেকে — ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়…
বেআইনি খনি নিয়ে কী ভাবছেন?
বেআইনি খনন কাজ বন্ধ করুন। আদালত। এটাই একমাত্র পথ। আইনের শাসনই চলবে।
বি. কে. হান্ডিক, তৎকালীন খনি মন্ত্রী — সাক্ষাৎকার
'খনি কোম্পানিগুলো সব বিনামূল্যে পাবে না'
৭৫ বছর বয়সি বিজয় কৃষ্ণ হান্ডিক খনি মন্ত্রক ও উত্তর-পূর্ব ভারত উন্নয়ন মন্ত্রকের পূর্ণমন্ত্রী। ২০০৯ সালের মে মাসে তিনি দায়িত্ব পান ও গত বছর খনিতে মূল্যভিত্তিক রয়্যালটি চালু করেন, যার দরুন রাজ্য সরকারগুলোর খনি থেকে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। রেড্ডি ভাইদের কেলেঙ্কারির পর গত সপ্তাহে বেল্লারিতে ১৮টা খনি লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। ফুসফুসের সংক্রমণে অসুস্থ থাকলেও ওরই মধ্যে হিন্দুস্তান টাইমসের (এইচটি) সঙ্গে কথা বলার সময় বের করে নিলেন তিনি। খনি বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কৃষ্ণা হান্ডিক, আলাপচারিতায় এইচটি প্রতিনিধি শালিনী সিং।
মন্ত্রকের নতুন খনি ও খনিজ বিল — যা খনি লবি বিরোধিতা করছে বলে মনে করা হয় — স্থানীয়দের খনির ২৬ শতাংশ মুনাফা দেওয়া ও তাদের অংশীদার করার কথা বলছে। তাদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে? অর্থ কীভাবে বিতরণ হবে?
বার্ষিক বৃত্তিকে নতুন আইনের অংশ করব ভাবছি আমরা। দেখুন, মানুষকে জমি ও আরও অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিনিময়ে তাঁরাও কিছু পাওয়ার হকদার। বার্ষিক বৃত্তি জিনিসটা বেশ আকর্ষণীয়, এমনকি ন্যায্য বলেও মনে হয়েছে। স্থানীয় মানুষের জন্য কার্যকর এই ধরনের ন্যায়বিচারই চাই। আইনে সব বিস্তারিত থাকবে, সেগুলো বাস্তবায়িত হতে বেশি দিন লাগবে না। কোথায় কীভাবে খনি হবে খতিয়ে দেখব, কী ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠছে বা কোথায় চাষবাস আছে সব বোঝা হবে। সব কিছুর জন্য একটা ব্যবস্থা থাকবে। যে জনগোষ্ঠী নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে, তাদের যাতে ভালো হয় — এইটা আমরা সবসময় মাথায় রাখছি।
টনপ্রতি নির্দিষ্ট লেভির বদলে ১০ শতাংশ রয়্যালটি নিয়ম কার্যকর করতে সরকারের এত দেরি হল কেন? ১০ শতাংশই বা কীভাবে ঠিক হল?
আমরা আইন বদলাব ভাবছি, কিন্তু কোথাও না কোথাও ঠিক আটকে যাচ্ছে। আইন মন্ত্রককেও সময় বের করতে হবে। ২-৩ দিন আগে বৈঠক হয়েছে, নতুন আইনে কী কী থাকবে শেষমেশ ঠিক হবে। নতুন আইন না আনলে এই পুরোনো জিনিসগুলো সামলানো যাবে না। সঠিক জিনিস নিতে হবে। ১৯৫৭ সালের খনি ও খনিজ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) আইনটা রীতিমতো তামাদি। এবার এর মধ্যেও পরস্পরবিরোধিতা আছে। আমরা চাই নতুন আইন আসুক, নতুন চিন্তাভাবনা আসুক — এটাই সবচেয়ে জরুরি। মানুষের জন্য, আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর আর তাদের উপকারের জন্য নতুন চিন্তাভাবনা দরকার।
খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী আর আদিবাসী জনজাতির মানুষদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। আর এই প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা দিতে বেশ কিছু প্যাকেজ থাকবে। একটু যদি ব্যাখ্যা করেন।
সে তো হতেই হবে, প্যাকেজ না থাকলে চলবে কেন! বার্ষিক বৃত্তির পরামর্শটা আমরা দিয়েছি। এবার কিছু লোক তো আছেই যাদের এসব হয়তো পছন্দ হবে না, কিন্তু একটা দায়বদ্ধতা কাজ করছে আমাদের ক্ষেত্রে।
কিছু লোক বলতে কি খনি কোম্পানিগুলোর কথা বলছেন, ওরাই পছন্দ করছে না?
টাকা খনি কোম্পানিকেই দিতে হবে। সব বিনামূল্যে পেয়ে যাবে, তা হবে না। ওদের অনেকেই বার্ষিক বৃত্তির বিষয়টা পছন্দ করে না। কিন্তু মানুষের সম্পত্তি চিরতরে নিয়ে কিছু দেবেন না? নকশালরা এই কথাই বলতে শুরু করেছে। মানুষকে ন্যায়বিচার দিতে হবে, সব নিজের কাছে রেখে তাদের কিছু না দিলে চলবে না।
আমরা কি আরও মানুষের কথা ভেবে খনি নীতি করছি?
হ্যাঁ, ঠিক তাই। উন্নয়নমুখী হবে — সেই সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে যাঁদের জমিতে তারা সম্পত্তি গড়ছে। মনে রাখবেন, জমিটা তাঁদের জমি। শেষ পর্যন্ত তাঁরা কিছু পাচ্ছেন না। কেউ এটা মানবে না। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো বাইরের দেশেও এখন মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এ হল প্রকৃতি — প্রকৃতিকে ধ্বংস করার অধিকার আপনার নেই। মেরামত করবে কে? খনি কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবেই প্রকৃতির ক্ষত সারিয়ে তুলতে হবে। নতুন খসড়া আইনে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; পুরোনো আইনে এটা ছিল না…
খনির ব্যাপারে উন্নয়নকে কী নতুন ভাবে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে তাহলে?
হ্যাঁ নতুন আইনে আমরা আরও দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করব ঠিক করেছি। মানুষ যাতে ন্যায়বিচার পায় সেইটাই সবার আগে দেখা হবে।
অন্যান্য দেশে খনিজের সন্ধান আর খননের জন্য আলাদা আলাদা সংস্থা থাকে। ভারতে দুটোই এক। এখন খনির ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও কী নতুন কোনও রাস্তার কথা ভাবছি আমরা?
না লাইসেন্স যেমন ছিল তেমনই থাকবে। আমরা চাই নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন হোক। বারবার খনি কোম্পানি আসবে, পয়সা খরচ করবে, তা তো হয় না – ছাড়পত্র পাওয়ার পরের ধাপগুলো আপনা থেকেই হওয়া দরকার। এ নিয়ে যেন দ্বিধা না থাকে। এইজন্যই তো খনি কোম্পানিগুলো ভারতে আসতে চায় না। ২০০৮ সালে তৈরি হওয়া নীতিটা মানতে পারে না তারা। আমি তখন খনি প্রতিমন্ত্রী ছিলাম। নিজেই দেখেছিলাম কীভাবে নানা দেশ থেকে সত্যিই লোকজন আসছে, বলছে তোমাদের দেশই প্রতিজ্ঞা করেছে যে মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া হবে।
খনির জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার কোনও সুসংহত পদ্ধতি এখনও নেই আমাদের এখানে। পরিবেশ আর খনি মন্ত্রক সমানতালে কাজ করবে এমন কোনও বৃহত্তর বন্দোবস্ত কি ভবিষ্যতে পেতে চলেছি আমরা?
হ্যাঁ এই দুটো হাত মিলিয়ে কাজ করবে এবার। একবার আমরা পুরোনো আইনটা একটু শুধরে নিই, খুবই তামাদি আইন বুঝলেন তো! – তারপর নতুন আইনে হাত দেব। পুরোনোটাই সংশোধন করে বসে থাকার বদলে আমরা নতুন আইন আনব ঠিক করেছি। নতুনভাবে আইনি বোঝাপড়া দরকার।
কেন আপনাদের মনে হল একটা নতুন আইন আনা জরুরি?
জিনিসগুলোকে তাদের পরিপ্রেক্ষিত থেকে বুঝতে হবে। স্বচ্ছতা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমরা চাই সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) মারফত ভারতে বিদেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করুক। আমাদের স্বচ্ছতার ব্যাপারে বিশ্বাসই না করতে পারলে তারা আসবে কেন? তাদের দিক থেকে পরিষ্কার বার্তা তো পেয়েইছি – তোমরা তোমাদের নীতি বদলাও, নয়তো আমরা আসব না। এফডিআই কিন্তু মোটা টাকার ব্যাপার, মোটা টাকা না থাকলে নতুন প্রযুক্তিও আসবে না। এদিকে আমাদের নতুন প্রযুক্তি দরকার। নতুন প্রযুক্তি আনলে উন্নতিও আসবে।
খনি সংক্রান্ত আলোচনায় সবচেয়ে বড়ো সমস্যার জায়গা হচ্ছে জমি-দখল। আদিবাসীরা খনন কাজের বিরুদ্ধে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তো ভয়েই এ পথ মাড়াবেন না। এই দিকগুলো মন্ত্রক কীভাবে দেখছে?
আজ অবধি বিনিয়োগকারীদের এই নিয়ে চিন্তা করতে দেখিনি। ওই যে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিটা – পসকো (পিওএসসিও), গত চার-পাঁচ বছর ধরে পাল্টা লড়ে যাচ্ছে। ওরা এখনও বলছে ওরা আশাবাদী আর স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস অর্জন করাটা জরুরি। গত চার-পাঁচ বছর ধরেই তো জমি দখল চলছে। যদি সাধারণ মানুষের মনে একবার বিশ্বাস জন্মায় যে এতে করে তাদেরও লাভ হবে, তাহলে খনি কোম্পানিগুলো চার-পাঁচ বছর ধরে যা করছে – ওরা সেটা এক বছরেই সেরে ফেলবে। এই কোম্পানিগুলো তো নিয়মবিরুদ্ধ/বেআইনি ভাবে নকশাল বা এমনি আরও লোকেদের টাকা দিচ্ছে। এই সব কমে যাবে। দিনের দিন ফিরফিরতি কাজকর্ম কমে যাবে। লোকে আর খনন কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইবে না। পসকোর ধারণা, মানুষ আমাদের পক্ষে আছে। তা তুমি যদি তাদের জিনিস কেড়েকুড়ে নিতে চাও, বার্ষিক বৃত্তির বেলায় মুখ ফিরিয়ে থাকো, তারা তো বলবেই যে আমাদের জিনিস নেওয়ার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে? স্থানীয় মানুষের কাছে যদি নিজের দায়বদ্ধতা দেখাতে পারো, মিছিমিছি কেনই বা তারা খনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যাবে?
বেআইনি খনি নিয়ে মন্ত্রক কী ভাবছে?
বেআইনি খনির সমস্যাটা সত্যিই ঘোরালো। মোকাবিলা করা খুব কঠিন। এত দিন এই যে সব খনি রাজ্যের হাতে ছিল, এই ব্যবস্থাটাই আসলে নষ্টের গোড়া। আসল অধিকার রাজ্যের হাতে। সব অনুমোদন রাজ্য সরকারই দেয় খনি কোম্পানিকে। আমরা নামিবিয়ার সঙ্গে কয়েকটা মৌ (MoU) চুক্তি করেছি। ওরা বলল ওদেরও নাকি এই বেআইনি খনির সমস্যায় ভুগতে হয়, মানুষ শোষণের শিকার হন, এইসব। আমরা দেখছি কীভাবে জিনিসটা সামাল দেওয়া যায়।
সাম্প্রতিক খনি কেলেঙ্কারি — কর্ণাটকে রেড্ডি ভাইদের প্রকল্প কিংবা মধু কোড়া ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার কী মত?
কর্ণাটকে বেআইনি খনির বিশাল রিপোর্ট আছে। নতুন আইন বানাই বা না বানাই, এই সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি চাইলে খনির বেআইনি কাজ কোনও ভাবে সামলাতেই হবে। এটাই একমাত্র ভদ্রসভ্য পথ।
অবিলম্বে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার? কেলেঙ্কারি রোখা যায় কীভাবে?
ভারতীয় খনি দপ্তর তদন্ত শুরু করেছে। নতুন আইনে, অবৈধ খনন আটকানোর ব্যবস্থা থাকবে। এতে লোকে ব্যক্তিগত বা সামাজিক স্তরেও বেআইনি খনির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। এখনও পর্যন্ত শুধু রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরাই অভিযোগ করতে পারে। নতুন আইনে সেদিক থেকে সুবিধে হবে। রাজ্য সরকার ইজারা দেয়, নেয় না – খুব কিছু তো করার থাকত না। এখন আমাদের আইবিএম এই অতিরিক্ত পদক্ষেপটা নিচ্ছে — ওরা ১২০ টা বেআইনি খনি চিহ্নিত করেছে, আপাতত কয়েকটার কাজ স্থগিত রেখেছে।
সেই তালিকায় গোয়া তো নেই। অথচ বেআইনি খনির ঘটনা সেখানেও ঘটেছে।
গোয়া একটু উঁচুদরের রাজ্য। ওড়িশায় হয়তো দেখবেন ৮০% জায়গায় খনন চলছে, কিন্তু রিপোর্ট জমা পড়েনি। তাই সেই নিয়ে এত কথাবার্তাও হয় না। গোয়ায় জনসংখ্যা বেশি, সাক্ষরতার হার বেশি, একটু কিছু হলেই মিডিয়ায় খবর হয়ে যায়। ছাড়পত্র বা অনুমতি ছাড়াই খনিজ তুললে তবেই না সেটা বেআইনি। গোয়ায় সমস্যাটা মূলত দূষণকেন্দ্রিক, আর অবৈধ খননের আওতায় দূষণের অভিযোগ পড়ে না। আমার গর্ব হয় যে আমাদের মন্ত্রক অবৈধ খনন চিহ্নিত করতে এই নতুন দূরসংবেদী নীতি অর্থাৎ রিমোট সেন্সিং এজেন্সি আনছে। মানুষের জানা উচিত আমরা কী করছি। লোকে যদি ভেবে নেয় যে সবাই অবৈধ খননে মদত জোগাচ্ছে, তারা এই গোটা ব্যবস্থার ওপর, আমাদের ওপর ভরসা রাখতে পারবে না।
এই নতুন আইনের ব্যাপারে খনি-শিল্পের প্রতিক্রিয়া কি?
মিশ্র প্রতিক্রিয়া বলা চলে। এই যে খনিজের প্রাথমিক খোঁজখবর থেকে খনির সম্ভাব্য ইজারা মেলার ধাপ পর্যন্ত ব্যাপারটা মসৃণভাবে উতরে যাচ্ছে এতে তারা খুশি। দ্বিতীয়ত, ভাড়া নেওয়া জায়গা হস্তান্তরের সুযোগ। নিজেদের ইজারা চাইলে এখন বিক্রিও করা যাবে, একজন অন্যজনের বকলমে এখন যেমন খনি চালায় – ওরকম না। দায়দায়িত্ব থাকবে। আমরা নিজেদের বাড়ি বা সম্পত্তি যেমন সরকারিভাবে হস্তান্তর করি, ইজারাও ঐভাবেই করা যাবে। তৃতীয়ত, আমরা বিচারসভা তৈরি করছি। যদি আপনি রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন দাখিল করে থাকেন, আর তারা বছরের পর বছর সেই নিয়ে গড়িমসি করে, দু’মাসের পর শুধু আপনিই সরাসরি ওই ট্রাইবুনালে যেতে পারবেন, ওখানে সব নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। কোম্পানিগুলো একটু মুষড়েও পড়েছে, কোন ব্যবসাদারই বা বার্ষিক বৃত্তি, ক্ষতিপূরণ, সিএসআর, এইসব ব্যাপারে কথা দিতে চায় বলুন?
দীর্ঘস্থায়ী খনিবলতে মন্ত্রক কী বোঝাতে চাইছে? কীভাবে ব্যাপারটা কার্যকর হবে?
দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন কাঠামোর তিনটি দিক থাকবে। এক, সামাজিক স্থিতিশীলতা — তাতে সরাসরি মানুষের উপকার। দুই, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা আর তিন, খনির অর্থনৈতিক কার্যক্রমের স্থিতিশীলতা। অপচয়মুক্ত খনি চাই আমরা। মাটি মায়ের বুক থেকে যা নিচ্ছ, এই সব প্রক্রিয়া চালাতে যেন তার এতটুকু নষ্ট না হয়। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি/যন্ত্রপাতি ব্যবহার করো এবং এমনভাবে পরিকল্পনা করো যাতে আকরিক থেকে যত বেশি সম্ভব বার করে আনা যায় — এমন যেন না হয় যে ৩০ বছরে সব খনিজ শেষ করে আমদানির দিকে তাকাতে হল। একটা ব্যবস্থা থাকবে, মন্ত্রক একজন পরামর্শদাতা নিয়োগ করেছে যাঁর তত্ত্বাবধানে খনিতে টেকসই উন্নয়নের বিশ্বেসেরা মান ও পদ্ধতি থেকে ভারতের জন্য প্রাসঙ্গিকগুলো নেওয়া হবে। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নকে খনি পরিকল্পনার অংশ করে নিতে হবে। সামাজিক স্থিতিশীলতা লঙ্ঘন হলে লিজ আপনাআপনি বাতিল হবে। আইবিএম গত ৬ মাসে ৪০টি লাইসেন্স বাতিল করেছে। রাজ্য সরকারগুলো খুব কিছু করছে না বলে আইবিএমকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে বেল্লারিতে নয় নয় করে ১৮টা খনি বাতিল হয়েছে।
রাজ্য ও কেন্দ্র খনি থেকে কত পাচ্ছে?
খনি ও খনিজ রাজ্যের সম্পদ, রয়্যালটি তারাই পায়। আগে সব রাজ্য মিলিয়ে বছরে ২,০০০ কোটি টাকা আসত। আমরা মূল্যভিত্তিক রয়্যালটি চালুর পর তা ৪,০০০ কোটিতে উঠেছে, এখন আরও বাড়বে। গোয়া প্রায় ৩০০ কোটি বেশি পেয়েছে — এত ছোটো রাজ্যের নিরিখে ব্যাপারটা কম খুশির নয়। আগে শুধু খনি কোম্পানি মুনাফা লুঠত, এখন লাভটা সবার হওয়া উচিত।
----------
ওয়েব লিংক:
- এই প্রতিবেদনটি ২০১০ সালে সিএসই মিডিয়া ফেলোশিপের আওতায় তৈরি। সম্পূর্ণ লেখাটি পাবেন এইখানে:
https://cdn.cseindia.org/userfiles/goa%20mining.pdf
- প্রতিবেদনের অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছিল হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়:
http://www.hindustantimes.com/india-news/mine-or-yours/article1-544184.aspx
- তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার:
http://www.hindustantimes.com/News-Feed/India/Cannot-deny-links-between-forest-depts-amp-mining-lobbies/Article1-544119.aspx
- তৎকালীন খনি মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার:
http://www.hindustantimes.com/News-Feed/India/Mining-companies-can-t-get-everything-for-free-Handique/Article1-544123.aspx