“আগেকার দিনে অতিথিদের সঙ্গে আমাদের মেলামেশা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেইসব পুরোনো দিনে সময়ের গতিও যেন মন্থর ছিল,” জ্যোতি ধায়ভাই তাঁর ছোট্ট রান্নাঘরের উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলি বলে ওঠেন। “বড়ো হওয়ার সময়, ঠাকুমার কাছে শিখেছিলাম যে মেহমান হামারে ভগবান, [অতিথি আমাদের কাছে ভগবানের সমান]। তখনকার দিনে মানুষজন আগে থেকে জানান না দিয়েই যখন তখন বাড়িতে এসে হাজির হতেন। এবং তাদের যত্নআত্তি করতে পেরে আমরা খুশিই হতাম।” জ্যোতিজির বেড়ে ওঠা যোধপুরে, তবে বিয়ের পর চলে আসেন উদয়পুরে। নিজের মারোয়াড়ি সংস্কৃতির সঙ্গে মেওয়ারি সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি।


Udaipur, Rajasthan
|THU, JAN 22, 2026
অতিথি, আপ্যায়ন, আহার
রাজস্থানে অতিথি আপ্যায়নের সাবেক রকমসকম
Author
Translator

Sweta Daga
রাজস্থানি ঐতিহ্য ‘মনওয়ার’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ আতিথেয়তা - যার সিংহভাগই জড়িত খাবারের সঙ্গে। মারোয়াড়ি ভাষায় ‘মনওয়ার’ অর্থে অনুরোধ বোঝালেও আদতে এটি আপ্যায়নের এমন এক রীতি যেখানে নিজের চেয়ে অতিথির চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে এই ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়নের রীতি জোরজবরদস্তির পর্যায়েও পৌঁছে যায়। প্রথা অনুযায়ী, প্রথমবার কিছু সাধলে ‘না’ বলাই দস্তুর। এভাবেই শুরু হয় আপ্যায়নকারী আর অতিথির মাঝে সাধাসাধি ও প্রত্যাখ্যানের সূক্ষ্ম বোঝাপড়া। শেষমেশ, অতিথিকেই হার মানতে হয়। কাউকে পাত পেড়ে খাওয়ানোর মধ্যে জড়িয়ে থাকে স্নেহের পরশ। মনে করা হয়, উদরপূর্তি যত বেশি হবে, স্নেহের প্রকাশও ততধিক হবে।

Sweta Daga
জ্যোতিজি ও তাঁর জা গায়ত্রী ধায়ভাই বিভিন্ন রাজস্থানি পদ মিলিয়ে দুটি ভিন্ন ধরনের ‘থালি’ (আক্ষরিক অর্থে থালা, তবে এখানে পুরোদস্তুর আহার অথবা ভোজ বোঝানো হয়েছে) তৈরি করেন। এর একটিতে থাকে ডাল, দই, ঘি ও গুড় সহযোগে বাজরে কি রোটি (বাজরার রুটি)। এই থালিতে আরও থাকে: গাট্টে কি সবজি (ঝোলসহ রান্না করা বেসনের ডাম্পলিং), খিচ (আধা-ভাঙা গম দিয়ে তৈরি ওটমিলের মতো থকথকে খাবার), ছোলার সবজি এবং লাল লঙ্কা বাটা। এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় রাব (ঘোল ও ভুট্টা দিয়ে তৈরি জাউ বা পরিজ), লঙ্কার সবজি, পঞ্চকুটা (রাজস্থানের মরুভূমিতে পাওয়া বিভিন্ন ক্যাকটাস দিয়ে তৈরি একটি পদ), কড়ি (দই ও বেসনের মিশ্রণে তৈরি টক ঝোল), আমের আচার এবং মিষ্টান্ন হিসেবে গমের মিঠে লাড্ডু।

Sweta Daga
দ্বিতীয় যে থালিটি তাঁরা তৈরি করেন, তার নাম ডাল বাটি - আরেকটি সহজ অথচ জনপ্রিয় পদ। ডাল ও সেঁকা আটার লেচি দিয়ে তৈরি এই পদটিকে ‘গরিবের খাবার’ বলা হয়। ভরপেট এবং পুষ্টিকর হওয়া সত্ত্বেও এই খাবারটি বেশ সাশ্রয়ী বলে এমন নাম। এখানে এটি কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা ও চুরমা (গুঁড়ো করা বাটির সঙ্গে গুড় ও ঘিয়ের মিশ্রণ) সহযোগে পরিবেশন করা হয়।

Sweta Daga
ধায়ভাই পরিবার বিগত ১৫০ বছর ধরে উদয়পুরের এই একই হাভেলি অর্থাৎ প্রাসাদে বাস করছেন। এককালে তাঁরা বিকানেরের রাজকুমারী, যিনি উদয়পুরের রাজাকে বিবাহ করেছিলেন, তাঁর রক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। পারিবারিক কিংবদন্তি অনুযায়ী তাঁরাই এই দম্পতির শিশুপুত্রকে তার নিজের কাকার হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তাদের দুজনকেই উদয়পুরে নিয়ে আসেন। এর ফলেই তাঁরা ধায়ভাই নামটি অর্জন করেন, যার অর্থ ‘একই দুধের ভাই’ অথবা সহোদর। পরবর্তীকালে তাঁরা ভারতের স্বাধীনতা পর্যন্ত রাজপরিবারের হয়ে কাজ করেন এবং কোনও একসময় মহারাজার ব্যক্তিগত সহকারীও ছিলেন। তাঁদের হাভেলিটি আজ ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যার পরতে পরতে রয়েছে খাবার তৈরির রকমারি পদ্ধতি এবং তা রসিয়ে খাওয়ার কত পন্থা।

Sweta Daga
গায়ত্রীজি রাজস্থানি খাবার-দাবারের ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলতে পেরে বেশ খুশি। রুটির জন্য বাজরা প্রস্তুত করতে করতে তিনি বোঝান, কিভাবে এখন পারিবারিক কাঠামোয় বদল এসেছে। “খাবার ও পরিবার - একে অপরের সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় আমরা সক্কলে একই ছাদের নিচে বাস করতাম। তবে আজকাল ওভাবে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে। সকলেরই বাড়তি জায়গা ও গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) চাই। বন্ধুবান্ধবদের গুরুত্ব বেড়েছে, মহিলারাও আজকাল অনেক বেশি সংখ্যায় বাড়ির বাইরে কাজ করতে যান। এই এত ব্যস্ততার মাঝে সেই আগের মতো সময় নিয়ে খাবার তৈরি করার ফুরসত কই? ফলে, একে অপরের সঙ্গে, পরিবার ও অতিথিদের সঙ্গে মেলামেশা করার রকমসকমও আজকাল বদলে গেছে।”

Sweta Daga
এমনকি থালির উপকরণেও বদল দেখা গিয়েছে। একই থালি বাড়িতে ও রেস্তোরাঁয় ভিন্ন উপকরণ সহযোগে পরিবেশিত হয়। আজকাল রেস্তোরাঁগুলো প্রথাগত খাবারের পরিবর্তে জনপ্রিয় খাবারই পরিবেশন করে থাকে। আগেকার দিনে, আপ্যায়নকারীরা খাবার পরিবেশন করতেন, আর লোকজন একই থালি থেকে খাবার ভাগ করে খেতে খেতে আড্ডা ও গল্পগুজবে মেতে উঠতেন। এটাও মানওয়ার প্রথারই একটি অংশ। বর্তমানে বুফে ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে পরিবেশন সংস্কৃতি বিলুপ্তপ্রায়। ফলে, অতিথি ও আপ্যায়নকারীর মাঝে স্নেহের সংযোগও কমে আসছে ক্রমশ।
পরিবেশ ও অর্থনীতিও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে অনেকাংশে। মানুষ যখন প্রধানত চাষবাস ও মাঠে কাজ করতেন, তখন তাঁদের পুষ্টির চাহিদা ছিল ভিন্ন। একইভাবে, জিনিসপত্রের সহজলভ্যতার বিষয়টিও অন্যরকম ছিল। মহিলারাও আজকাল উপার্জনকারী হয়ে উঠছেন, তবে পুরুষরা এখনও তাঁদের সঙ্গে রান্নাবান্নায় হাত মেলাতে নারাজ। ফলত, বাড়িতে পুষ্টিকর খাবার তৈরি করার মতো প্রয়োজনীয় সময়ের অভাব দেখা দিয়েছে।

Sweta Daga
জ্যোতিজির ছেলে বিশাল ধায়ভাই (৩২) পুরোনো ও নতুন রীতির মধ্যে একটি সামঞ্জস্য আনার কথা বলেন। এই ‘জিরো-ওয়েস্ট’ অথবা বর্জ্যমুক্ত পরিবেশকর্মীর মতে, অতিথি আপ্যায়নের বিষয়টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। “বাড়িতে কেউ এলে তাঁকে খালি পেটে ফেরত পাঠানো ঠিক কাজ নয়। তবে আজকাল তাঁদের ইচ্ছে অনিচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়,” স্বীকার করেন তিনি। “আজকাল আর জোরজবরদস্তি চলে না। ওঁরা ‘না’ বললে মেনে নিই। ঐতিহ্য, রীতিনীতি হৃদয় দিয়ে পালন না করলে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আমার এবং পরবর্তী অন্যান্য প্রজন্মও এই দশাই দেখছে। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমাদের হয়তো ঔদার্য কমে গেছে - কেবল ভয় হয় সকলের জন্য হয়তো পর্যাপ্ত সবকিছু নেই, সে সময় হোক, খাবার হোক অথবা সম্পদ। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না, তবে পুরোনো ঐতিহ্যের ঝলক আজও কিছুটা দেখতে পাই। তফাৎ কেবল এই যে, তাদেরকে প্রতিনিয়ত ‘আধুনিকের’ সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হচ্ছে।”

Sweta Daga
এখানে খাওয়া দাওয়ার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। রাজস্থানিরা কোন খাবারের সঙ্গে কি চলবে সে বিষয়ে বেশ সচেতন। তাঁদের খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে এই নিয়মগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাদ ও হজম - এই দুই দিক বিবেচনা করেই প্রতিটি রুটির (গম, ভুট্টা, বাজরা এবং জোয়ার) সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু সবজি ও ডাল জুড়ে দেওয়া হয়। “সবকিছু একসঙ্গে খেয়ে মজা নেই!” হাসতে হাসতে বলে ওঠেন জ্যোতিজি। “যেমন, মাক্কি কি রোটির [মকাইয়ের রুটি] সঙ্গে উড়াদ কি ডাল [মাসকলাই ডাল] ভালো যায়। আবার বাজরার রুটির সঙ্গে কড়ি অথবা মুগ ডালের স্বাদ মানানসই। আমাদের দিদিমা-ঠাকুমাদের এমনটাই করতে দেখে এসেছি। তাই, আমরাও সেই একই নিয়ম মেনে চলি।”
‘মনওয়ার’ প্রথাটি আজ টিকে থাকলেও আগের সেই জাঁকজমক কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। থালি ভর্তি ঐতিহ্যবাহী রাজস্থানি খাবার এখন আর অতিথি আপ্যায়নের নিয়মিত অংশ নয়, বরং কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানের অভিনব আয়োজন হিসেবেই দেখা যায়। তা সত্ত্বেও খাওয়া-দাওয়া আজও এই সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্নেহের বাঁধন।
বাড়িতে তৈরি সুস্বাদু খাবারের জায়গা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে প্রি-প্যাকেজড খাবার। মহিলারা যেহেতু আজকাল অনেকেই বাড়ির বাইরে কাজ করতে বেরোন, তাঁদের উপর ঘরের ও বাইরের - দুদিকেরই দায়িত্ব এসে পড়ে। “যতদিন আমাদের প্রজন্ম বেঁচে আছে, আমরা এই ঐতিহ্য বজায় রাখব,” জানান জ্যোতিজি। “তবে সময় তো বদলাবেই। আমাদের কেবল একটা সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে। এটুকুই আর কি।”
এই প্রতিবেদনটি লেখকের সিএসই ফুড ফেলোশিপের অন্তর্গত
বিশাল সিংহ এবং তাঁর পরিবারকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
অনুবাদ: অধ্যেতা মিশ্র
অনুবাদ সম্পাদনা: স্মিতা খাটোর
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
Donate to PARI
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/guests-gods-and-gastronomy-bn

