তবে গোণ্ডির কিন্তু বরাবর এমন দৈন্যদশা ছিল না।
“...প্রাচীন গন্ডোয়ানা রাজ্যের রাজভাষা ছিল গোণ্ডি, এ ভাষার নিজস্ব লিপি, ব্যাকরণ, অলংকার, ব্যুৎপত্তি, সাহিত্য সবই ছিল, যার প্রমাণ আজও মেলে,” গোণ্ডি সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ মোতিরাম কাঙ্গালির এই উদ্ধৃতিটি ভাষা গবেষণা ও প্রকাশনা কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে দেওয়া রয়েছে।
অধুনা মধ্যপ্রদেশের অনেকখানি অংশ এককালে গোণ্ডদের শাসনাধীন ছিল। “আমরা গৌরা মায়ের [হিন্দু পুরাণকথায় তিনি পার্বতী বা দুর্গা নামে পরিচিত] বংশধর, এইজন্যই আমরা নিজেদের গোণ্ড বলে ডাকি,” ছিন্দওয়ারার গোণ্ড সমাজকর্মী রামনাথ পার্তেতি জানাচ্ছেন। তবে সঙ্গে এটাও বললেন যে সাম্প্রতিককালে এ জনজাতির সুসমৃদ্ধ বিরাসত ও ইতিহাস কেবল প্রতীকী উদযাপনের ভিক্ষাপাত্র হয়ে উঠেছে, এই যেমন গোণ্ড রানি কমলাপতির নামে একটি রেলস্টেশনের নাম রাখা।
এ জনগোষ্ঠীর মুখের বুলিটাও ফিকে হয়ে আসছে, মূলত বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ। বাইরে, অর্থাৎ জনসমাজের মাঝে গোণ্ডরা সাধারণত হিন্দিতেই কথা বলেন। মোটের উপর কেবল বয়োজ্যেষ্ঠরাই গোণ্ড ভাষায় কথা বলেন, কমবয়সিরা এই ভাষা শিখতে কিংবা গোণ্ডি ভাষায় কথা বলতে কুণ্ঠিত বোধ করছে। অনেকেরই মতে এর কারণ ভুল বোঝাবুঝি, কিংবা অগোণ্ডিদের দরবারে হাসিঠাট্টার পাত্র হয়ে ওঠা।
প্রার্থনার বাবা মন্তরাম পার্তেতি একজন কৃষক, এই গ্রামেই থাকেন। ভিটেয় থাকলে বাচ্চাদের সঙ্গে গোণ্ডিতে কথা বলেন ঠিকই, তবে চৌকাঠ ডিঙানো মাত্র শুরু হয়ে যায় হিন্দি, এমনকি বাড়ির লোকের সঙ্গেও। “ওরা [গোণ্ডি ভাষাভাষী নন যাঁরা] হয় আমাদের খিল্লি ওড়ায়, কিংবা আমাদের কথাগুলোর ঠিক মানে বুঝতে পারে না,” তিনি বললেন, “লোকে আজও আমাদের পিছনে লাগে [গোণ্ডিতে কথা বললে]।”
ছেলে পৃথ্বীরাজ একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়ে, তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ঘিরে এক কাহিনি শোনালেন মন্তরাম: “ওর সঙ্গে গোণ্ডি ভাষায় কথা বলা আরম্ভ করলাম। সেটা শোনামাত্র শিক্ষক ও শিশুরা আমাদের দেখে হাসতে লাগল, ওরা কেউই গোণ্ডি জানত না। আমি বড্ড লজ্জা পেয়েছিলাম।” এরপর থেকে তার বাবা স্কুলে দেখা করতে এলে যেন কক্ষনো আর গোণ্ডি না বলে, এই মর্মে পৃথ্বীরাজ মানা করে দিয়েছে। “ও আমায় বলেছে, যখন ঘরে থাকব তখন যত খুশি গোণ্ডিতে কথা বোলো।”
মূলত গোণ্ড অধ্যুষিত গ্রাম হয়েও লোনাদেই এক বিচিত্র লড়াইয়ে সাক্ষী: নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষায় কথা বলাতে আর তাকে নিয়ে গর্ব করা শেখাতে গিয়ে লোকে রীতিমতো নাজেহাল। রামনাথের কথায় একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেল, লোনাদেইয়ের বাস্তবটা এ জেলার বৃহত্তর বাস্তবের একটি প্রতিবিম্ব মাত্র। “ছিন্দওয়ারায় গোণ্ডদের নিচুজাত বলে ধরা হয়। তাই জনসাধারণের মাঝে গোণ্ডিতে কথা বললে পাছে অন্য লোক তাঁদের ছোটো চোখে দেখে, এই ভয়েই তাঁরা অস্থির। তাই, ওঁরা কেবলমাত্র নিজেদের সঙ্গেই গোণ্ডিতে কথা বলা পছন্দ করেন,” তিনি জানাচ্ছেন।
রামনাথ পার্তেতির বিশ্বাস, স্কুল ব্যবস্থাও গোণ্ড জনজাতির বিরুদ্ধে বৈষম্য বজায় রেখেছে, তাছাড়া গোণ্ডি ভাষা আর সেই ভাষার মানুষের মাঝে পাঁচিল খাড়া করায় তাদের মস্ত বড়ো ভূমিকা তো আছেই। রামনাথের স্পষ্ট মনে আছে, অটরওয়াড়া ব্লকে তাঁর গাঁয়ের সরকারি বিদ্যালয়ে কীভাবে তাঁর বেরাদরির শিশুদের নিদারুণ হেনস্থার মুখে পড়তে হত।
তথাকথিত উচ্চবর্ণের শিক্ষক গোণ্ড বাচ্চাদের আলাদা করে বসাত, অন্য জাতি তথা জনজাতির শিশুদের থেকে খানিকটা তফাতে। তবে সেখানেই শেষ নয়। “যদ্দূর মনে পড়ে আমি তখন ক্লাস টেনে, একদিন দেখলাম শর্মা স্যার আমারই গ্রামের দুটি গোণ্ড ছেলেকে খিস্তি মারতে মারতে বেধড়ক পেটাচ্ছে আর বলছে, 'তোরা গোণ্ডের ছেলে। তোরা কক্ষনো কিছু শিখবি না; সে আমি যতই খেটেখুটে পড়াই না কেন।' ছেলেদুটি সেদিনের পর থেকে আর কোনও দিনও স্কুলমুখো হয়নি।”