২০১৮ সালের ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে গ্রাইন্ডমিল সংগস্ প্রজেক্টের তরফে আমরা নন্দগাঁওয়ের শাহু কাম্বলের থেকে নিয়ে এলাম চারখানা ওভি। এ গানে ফুটে উঠেছে পুরুষের নির্যাতনে অতিষ্ঠ এক নারীর ক্ষোভ ও ঘৃণা


Pune, Maharashtra
|FRI, JUN 20, 2025
জাঁতার রোষে বিদ্ধ হবে অত্যাচারী পুরুষ
Author
Photographer
Editor
Translator
একি মোর মাইয়াটারে অকথ্য সব গাল পাড়ে শয়তান,
মনে হয় দেখলে তারে চোখের ভিতর বিঁধছে শামাধান
মেয়েদের উপর লাগাতার যৌনহিংসা, অত্যাচার ও হয়রানির বিরুদ্ধে আজ প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে তামাম দুনিয়ায়, অথচ শাহুবাই কাম্বলে বোধহয় দুই দশক আগেই এ ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছেন। বিগত এক বছর ধরে এই জাতীয় অপরাধ প্রকাশ্যে আসায় টালমাটাল হয়ে গিয়েছে গণমাধ্যম, বিনোদন আর শিক্ষাজগৎ। #মিটু আন্দোলনের জেরে অপেক্ষাকৃত স্বল্প-পরিচিত সিনেমা তারকারাও বেপরোয়া হয়ে বিশ্বমঞ্চে জানিয়েছেন পুরুষের হাতে তাঁদের অবমাননার কাহিনি।
নন্দগাঁও গ্রামে তাঁর ছোট্ট একচিলতে কামরাটাই ছিল শাহু কাম্বলের 'মঞ্চ', এখানে বসেই তিনি সাধের জাতে বা চাক্কি (জাঁতা) ঘুরিয়ে গম ভেঙে আটা বানাতেন। গাঁয়ের হতদরিদ্র মহিলাদের কাছে এই জাঁতা এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিসর দেয়। অত্যাচার ও হয়রানি সহ নানান বিষয়ে শাহুবাই তাঁর নিজের মতামত প্রকাশ করে গিয়েছেন স্বরচিত ওভির মাধ্যমে। এই সাঙ্গীতিক ধারাটি আজ জাট্যাভারচ্যা ওভ্যা (জাঁতাপেষাইয়ের গান) নামে পরিচিত।
২০১৬ সালে সত্তর বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানোর আগে পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের পুণে জেলায় নিজের গাঁয়ের ঘরে বসে বসেই একাজ করে গিয়েছেন তিনি। নন্দগাঁওয়ের বাইরের জগৎ তাঁকে কোনোদিনও চেনেনি, জানেনি।
শাহুবাইয়ের দোহায় দোহায় প্রতিধ্বনিত হয় সেসকল নারীর কথা, গতবছর যাঁদের ক্ষোভ-প্রকাশের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল গণমাধ্যম। বিশ্বসমাজের প্রতিটা স্তরে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা যে ঘৃণ্য শ্বাপদদের থেকে নারী, শিশু, এমনকি পুরুষেরাও রক্ষা পায় না, এখন গণমাধ্যমে তাদের মুখোশ টেনে খোলা হয়েছে। উন্মোচিত হয়েছে আরও একটি সত্য — এই নির্যাতকদের অধিকাংশই পুরুষ, যারা হয় মৌখিক বা শারীরিক, কিংবা দু'ভাবেই নিগ্রহ চালায় মেয়েদের উপর।
ইউএন উইমেনের সর্বশেষ রিপোর্ট মোতাবেক, বিশ্বব্যাপী ৫০ অনূর্ধ্ব নারীদের এক-পঞ্চমাংশ ১২ মাসের মধ্যে একবার না একবার তাঁদের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর হাতে শারীরিক এবং/কিংবা যৌনহিংসার শিকার হন। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এই সংখ্যাটা ২৩.১ শতাংশ, যার মধ্যে ভারতবর্ষও পড়ছে।
এদেশের শহরে-গ্রামে সর্বত্রই এমনতর হিংসা, হয়রানি এবং আরও ভয়ানক সব জিনিসপত্র ব্যাপকভাবে প্রচলিত। শাহুবাই ঠিক এই ছবিটাই তীব্র ঘৃণা এবং ক্রোধে ভরা গানের ক্যানভাসে এঁকেছেন তাঁর গাঁয়ের প্রেক্ষাপটে।
ইউএন উইমেন রিপোর্ট অনুসারে, লিঙ্গ সমতা নির্দেশকের নিরিখে ২০১৫-১৬ সালের তথ্যে এটাও উঠে এসেছে যে ভারতে সম্পদ ও অবস্থানের সম্মিলিত প্রভাব বৃহৎ মাত্রায় বৈষম্য সৃষ্টি করে। ধনবান শহুরে পরিবারের তুলনায় গ্রামে-গঞ্জে গরিব ঘরের ২০-২৪ বছরের মেয়েদের ক্ষেত্রে:
১৮ বছরে পা দেওয়ার আগেই বিয়েশাদি হওয়ার সম্ভাবনা ৫.১ গুণ বেশি;
কোনোদিন ইস্কুলমুখো না হওয়ার সম্ভাবনা ২১.৮ গুণ অধিক;
কৈশোরেই মা হওয়ার সম্ভাবনা ৫.৮ গুণ বেশি;
নিজের শখে বা প্রয়োজনে ইস্তেমাল করার মতো টাকা হাতে না থাকার সম্ভাবনা ১.৩ গুণ বেশি
আর টাকাপয়সার খরচাপাতি বিষয়ে কোনও মতামত দিতে না পারার সম্ভাবনাও বেশি ২.৩ গুণ।
এ পরিসংখ্যান কীসের ইঙ্গিত দেয়? অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে বাড়ির মেয়েরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ছেলেদের উপর নির্ভরশীল। আর এই ঘটনাটা শহুরে অঞ্চলের থেকে গ্রামীণ এলাকাতেই বেশি প্রকট। এমনতর পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ফলে কিছু মরদ ঘরে-বাইরে সমস্ত জায়গায় নারীর উপর অত্যাচার করার লাইসেন্স পেয়ে যায় — সে কর্মক্ষেত্রেই হোক কিংবা মাঠেঘাটে-রাস্তায়।
মেয়েদের সামাজিক পরিচয় তথা লিঙ্গসংক্রান্ত নানান বিষয় ঘিরে কয়েকশো ওভির মহাফেজখানা আমাদের এই জাঁতাপেষাইয়ের গানের প্রকল্প। পারি এই ডেটাবেস থেকে পয়লা কিস্তির গানমালা প্রকাশ করেছিল ২০১৭ সালের মার্চে, তাতে বর্ণিত রয়েছে এ বিশাল কর্মকাণ্ডের ইতিহাস সহ কর্মীদলের বিবরণী।
নারীর প্রতি পুরুষের নিপীড়ন এবং অপমান তথা হিংসার হুমকি — কেবলমাত্র এ বিষয়ের উপরেই প্রায় ৫০০ টা দোহা রয়েছে। এই হেনস্থার বুনিয়াদ কেবল লিঙ্গ নয়, শ্রেণি ও জাতপাতও বটে, যেহেতু আর্থসামাজিক ভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বর্গের উপর ক্ষমতা কায়েম করে রেখেছে শক্তিশালী বর্গের মানুষজন।
জিএসপি'র এই কিস্তিতে আমরা শাহু কাম্বলের একটি অডিও ক্লিপ পরিবেশন করছি। ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭-য় আমাদের মোলাকাত হয় তাঁর পরিবারের সাথে — ছিলেন শাহুবাইয়ের স্বামী, দুই ছেলে-বৌমা ও তাঁদের সন্তানসন্ততি। তাঁরা আজও নন্দগাঁওয়ে নিজেদের বাসাতেই থাকেন, আমরা সেখানেই গিয়েছিলাম। অবশ্য শাহু কাম্বলের ছবি তোলার সময় দেওয়ালে টাঙানো তাঁর আলোকচিত্রটির দিকে ক্যামেরা তাক করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।

Samyukta Shastri
প্রবল ওজস্বী এই চারখানা ওভি ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে রেকর্ড করেছিলেন জাঁতাপেষাইয়ের গানের আদি দলের কর্মীরা। দোহাগুলিতে প্রকাশ পেয়েছে একটা অত্যাচারী লোকের প্রতি বিক্ষুব্ধ এক নারীর প্রবল রাগ ও ঘৃণা।
কোনও পুরুষ যদি একজন মহিলার উপর নিপীড়ন চালায়, তাহলে সে মেয়ের মধ্যে ধুঁইয়ে ওঠে প্রবল রাগ, অত্যাচারী লোকটির প্রতি একরাশ ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই সে অনুভব করে না।
শাহুবাই গাইছেন যে তাঁর বাবা ঠিক বাঘের মতো তেজী, আর তিনি নিজেও সাক্ষাৎ রায়বাঘিনী। মূর্খ এক পুরুষের জঘন্য টোন-টিটকিরি শুনে তিনি ফেটে পড়ছেন নিদারুণ রাগে।
সেই অসভ্য লোকটিকে ডেকে তাই বলছেন যে তার লোভ-লালসা অত্যন্ত জঘন্য, যথাসাধ্য তাকে তিরস্কারও করছেন। সাথে গাল পেড়ে এও জানিয়ে দিচ্ছেন: 'মরবি যখন তুই...রাখিস জেনে যমের হাতে খেতেই হবে মার।' তাঁর এই তিরস্কারের প্রাবল্য থেকে টের পাওয়া যায় লোকটি তাঁকে ঠিক কতখানি নোংরাভাবে মৌখিক নির্যাতন করত।
পরবর্তী ওভিতে শাহুবাই গাইছেন যে সেই নিকৃষ্ট লোকটা তাঁর মেয়েকেও অশ্লীল কথাবার্তা বলেছে, আর তার উপস্থিতি চোখে শামাধানের (পানিকম সুমাত্রেন্সে বা পানিক ঘাস) তীক্ষ্ণ বীজ বিঁধে যাওয়ার মতন যন্ত্রণাদায়ক। লোকটাকে তিনি জানিয়ে দিচ্ছেন, সে বৃষ্টির পর দোরগোড়ায় জমা নোংরা কাদাপাঁকের মতই ঘৃণ্য। অন্তরের যাবতীয় অবজ্ঞা উগরে দিয়ে শেষে যেন অস্থির হয়ে বলছেন -- আর কী কী ভাবে তিনি নিজের রাগ-ঘেন্না প্রকাশ করবেন, শয়তান লোকটাই সেকথা বলুক এবার।
নিচের চারটি ওভি শুনুন:
अशी बाजी माझ्या वाघ मी वाघाची वाघीण
कसा बोलला येडा मूरख, झाली देहाची आगीन
पापी रे चांडाळा, तुझी पापाची ती रे वासना
अशी मरणाच्या ना वेळ, तुला यमाची जाचना
अशी पापी रे चांडाळा, माझ्या बाईला बोलला
कशी राळाच्या कणीवाणी, माझ्या नेतरी तो सलला
अशी पाण्या ग पावसानी, दारी चिखल रापला
अशी येड्या तु रे मुरखा, किती देऊ तुला दाखला
ভীষণ তেজী বাপটা আমার, রায়বাঘিনী আমিও ভাই,
টোন কেটেছে একটা ছাগল, গেলেম রেগে ভীষণ তাই।
পাপিষ্ঠ রে তুই...লোভ-লালসায় ডগমগ, নেইকো কোনও পার —
মরবি যখন তুই...রাখিস জেনে যমের* হাতে খেতেই হবে মার।
একি মোর মাইয়াটারে অকথ্য সব গাল পাড়ে শয়তান,
মনে হয় দেখলে তারে চোখের ভিতর বিঁধছে শামাধান।
মুষলধারে ভাঙলে বাদল, কাদায় পাগল দোরগোড়া,
শোন্ রে ছাগল, আর কত গাল পাড়ব তোকে বল্ দাঁড়া?
*বিঃদ্রঃ বৌদ্ধ পুরাকথায় যম হলেন মৃত্যুলোকের রাজা

Samyukta Shastri
পরিবেশক/গায়ক: শাহু কাম্বলে
গ্রাম: নন্দগাঁও
তালুক: মুলশী
জেলা: পুণে
জাতি: নববৌদ্ধ
বয়স: ৭০ (জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অগস্ট ২০১৬-তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি)
সন্তান: দুই মেয়ে ও দুই ছেলে
পেশা: চাষি
তারিখ: এই গান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য রেকর্ড করা হয় ১৯৯৯ সালের ৫ই অক্টোবর। ছবিগুলি তোলা হয়েছে ২০১৭-র ১১ই সেপ্টেম্বর।
পোস্টার: সিঞ্চিতা পর্বত
অনুবাদ: জশুয়া বোধিনেত্র
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
Donate to PARI
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/four-songs-of-fury-for-abusive-men-bn

