মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধা জেলার কুরজডি গাঁয়ের কিনার ঘেঁষে এক চিলতে বাড়িটা। সেখানে উজ্জ্বলা পেঠকর (৪১) আর তাঁর জা ঊষা পেঠকর (৪৫) প্রায়ই বসে আলোচনা করেন অনেকক্ষণ – এ বছর কোন বীজ বোনা যাবে, পরের মরসুমে কী চাষ করলে ভালো, এইসব নানা কিছু। আজ চাষবাসের সুবাদেই তাঁরা বেঁধে-বেঁধে আছেন বটে কিন্তু মাত্র কয়েক বছর আগে এক প্রবল দুঃসময় মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল দুজনকে।
তাঁদের স্বামীরা ছিলেন দুই ভাই। গলা পর্যন্ত দেনা হয়ে যাওয়ায় আর কোনো পথ না পেয়ে দুজনেই আত্মঘাতী হন।
দুই জায়ের ওপর দিয়েই অনেক ঝড় গেছে সেসময়। স্বামী হারানোর শোক তো ছিলই, তার উপর সামনে জমে উঠছিল পাহাড়প্রমাণ সমস্যা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালানো আর স্বামীর ঋণ শোধ করা – এগুলোই আগে দেখতে হত। কীভাবে যে কী করবেন, একদমই বুঝতে পারছিলেন না।
"২০০২ সালে উনি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার পর মনে হলো আমার দুনিয়াটা যেন ভেঙে পড়েছে। তখন বাচ্চাদুটো ছোটো, টাকাপয়সার বিষয়ে কিছুই জানতাম না, এমনকি আমার স্বামীর জমির খুঁটিনাটি ব্যাপারেও কোনো ধারণা ছিল না। মনে হচ্ছিল একেবারে নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে," বলছিলেন উজ্জ্বলা। তাঁর স্বামী প্রভাকর মারা যাওয়ার সময় দুই লক্ষ টাকা ঋণ রেখে গিয়েছিলেন।
গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, ভারতসহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন আনে গ্রামের মেয়ে-মহিলাদের শ্রম। ভারতে উৎপাদন-উদ্যোগ বলতে কৃষিকাজই বৃহত্তম, দেশের জিডিপিতে ষোলো শতাংশ অবদান তার। আর এই কৃষিকাজ দিন দিন আরও বেশি করে মেয়েদের শ্রমনির্ভর হয়ে পড়ছে। আজকাল যে বাজারকেন্দ্রিক ‘উৎপাদনক্ষম কর্মী’ কথাটা চালু আছে, তার সংকীর্ণ গণ্ডিটার বাইরে গিয়ে গ্রামীণ ভারতের প্রায় সব মহিলাকেই কোনো না কোনোভাবে কৃষক বলা যায় – তাঁরা কেউ খেতমজুরি করেন কিংবা পরিবারের জমিতে বিনা মজুরিতে কাজ করেন, কেউ আবার দুটোই।
এই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই কৃষিকাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাদেরই অন্যতম এম.এস. স্বামীনাথন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের 'মহিলা কিষান সশক্তিকরণ পরিযোজনা' প্রকল্প। ২০০৮ সালের কৃষিসংকটে পর্যুদস্ত মেয়েদের বল-ভরসা জোগাতে সে বছরেই মাঠে নেমে পড়ে এই প্রতিষ্ঠান। বিদর্ভ অঞ্চলের সবচেয়ে সংকটাপন্ন দুটো জেলা – ওয়ার্ধা আর ইয়াভতমলের ওপরেই বেশি জোর দেওয়া হবে বলে ঠিক করা হয়। সোজাসাপ্টা একটা লক্ষ্য ছিল তাঁদের: টেকসই কৃষিকাজের মাধ্যমে মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তোলা। বিশ্বাস ছিল, পরিবারের মেয়েটি যদি সক্ষম হয়ে ওঠে, তাহলে বাচ্চারা এমনিতেই উপকৃত হবে।
এরপর দেখতে দেখতে, আর সব মেয়েদের সঙ্গে উজ্জ্বলা আর ঊষাও এই প্রকল্পে যোগ দিলেন। প্রকল্পের আওতায় পঞ্চান্নখানা গ্রাম জুড়ে ছিয়াশিটি দলে প্রায় এক হাজার তিনশো চুয়ান্নজন কিষানি সংগঠিত হলেন। আজ প্রায় তিন বছরের বেশি সময় পার করে, সাফল্যের ছবিটা এখন পরিষ্কার।
প্রায় একশোজন কিষানি এখন কোনও একরকম টেকসই কৃষিপদ্ধতি অনুসরণ করছেন, তাতে চাষের খরচ কমেছে। আড়াইশোরও বেশি মহিলা নিজেদের বাড়িতে রান্নাঘর লাগোয়া বাগান তৈরি করেছেন, ফলে খাবারে বৈচিত্র্য এসেছে, আর সব মিলিয়ে পুষ্টির মান উন্নত হয়েছে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা – অনেকে এখন নিজেই চাষবাস বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।
এই যেমন, উজ্জ্বলার কথাই ধরা যাক। এক লক্ষ টাকা ঋণ শোধ করে ফেলেছেন তিনি, মেয়েকে নার্সিং কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। পাঁচ একর সেচ-দেওয়া জমিতে এখন নিজে তুলো, অড়হর, সয়াবিন আর গম চাষ করেন। জমিটাও নিজের নামে করিয়ে নিয়েছেন – স্বামীর আত্মহত্যার পর খুব দরকার ছিল এটার।
ঊষাও পিছিয়ে থাকেননি। ইতিমধ্যে এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, আরেকজনকে নার্সিং প্রশিক্ষণ করিয়েছেন। দুই ছেলে এখন চাষবাস করছেন। বলেন, "আমার বর এক লক্ষ ষাট হাজার টাকার দেনা রেখে গিয়েছিলেন, তার বেশিরভাগটাই শোধ করে ফেলেছি। এখন মাত্র পঁচিশ হাজার বাকি।" তাঁর স্বামী কাউদোজি ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মঘাতী হন।
প্রকল্পের সমন্বয়কারী কিশোর জগতাপের মতে, এ তো সবে শুরু। দৃশ্যতই বড়ো পরিবর্তন আসতে এখনও অনেক সময় লাগবে। "মহিলাদের পাশাপাশি আমরা শিশুদের দিকেও নজর রাখছি, কারণ ভবিষ্যতে তারাই এই জমির উত্তরাধিকারী। গত বছর ব্যাপক অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি মহিলা রক্তাল্পতায় ভুগছেন। তাই মেয়েদের শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি জোগালেই হবে না, সামগ্রিকভাবে ভাবতে হবে। মহিলাদের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেলে, বাড়ির বাচ্চারা আপনা থেকেই তার সুফল পাবে।”
ইয়াভতমল জেলার ইন্দিরা মেশরামের মতে গত কয়েক বছরে তিনি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। ২০০৯ সালে প্রকল্পটায় যোগ দেন রালেগাঁও ব্লকের তাকলি গ্রামের বাসিন্দা এই ক্ষুদ্র চাষি। “তার আগে তো চাষবাসের কিছুই জানতাম না। এখন সার বলুন, খাদ্য সুরক্ষার গুরুত্ব বলুন, সবই বুঝি। ঘরের সব সিদ্ধান্ত এখন আমিই নিই – শুধু চাষের না, সব কিছুর। ছেলেকে সমাজকর্মে স্নাতক পড়াতে পাঠানোর সিদ্ধান্তটাও আমার নিজের।" ইন্দিরাকে এখন এলাকার বিভিন্ন জায়গায় অন্য মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে ডাকা হয়, স্বাধীনভাবে বাঁচার গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি।
এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান মহিলাদের পরিষদ তৈরি করতে সাহায্য করেছে, মাঝেমাঝেই নানা বিষয় আলোচনার জন্য তার বৈঠক বসে। "এক মহিলা আরেক মহিলাকে শেখান" – এটাই তাঁদের মূলমন্ত্র। বছরে একবার মেলা বসে, সেখানে সবার সঙ্গে সবার দেখা হয়, যে যার নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।
এই উদ্যোগের সাফল্য দেখে ২০১০ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি 'মহিলা কিষান সশক্তিকরণ পরিযোজনা'র জন্য একশো কোটি টাকা বরাদ্দ করেন আর সারা দেশজুড়ে এ প্রকল্পটি চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক এর দায়িত্ব নেয় আর ভারতজুড়ে দক্ষ এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাদের থেকে প্রকল্পে অংশগ্রহণের আবেদন চাওয়া হয়। শেষমেশ, মনোনীত এনজিওগুলো কাজ শুরু করার চার মাস পর, ২০১২ সালের এপ্রিলের শুরুতে প্রথম পর্যালোচনা বৈঠক বসে।
এখন মহারাষ্ট্র, কেরালা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশে প্রায় দশটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এই প্রকল্পের শরিক। লক্ষ্য হল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কিষানি অর্থাৎ তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত কিংবা সংখ্যালঘু, স্বামীহারা ও বিবাহসম্পর্কে না থাকা বা এমনি আরও সব মহিলাদের সক্ষম করে তোলা।
কোলহাপুরের শিবাজী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা চর্চা কেন্দ্রের পরিচালক মেধা নানিভাড়েকরের মতে, এই ধরনের কর্মসূচি সত্যিই খুব দরকারি। তবে সরকারকে নমনীয় হতে হবে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গার নিজস্ব ধরনধারণ ও পরিস্থিতি বুঝে সেখানেও এমন ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, "সরকারি প্রকল্পগুলো সাধারণত কাগজেকলমে দারুণ দেখতে। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় হাস্যকর সব নিয়মকানুনের দরুন প্রায়ই কিছু করা যায় না।"
অদৃশ্য চালিকাশক্তি
অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় মহিলাদের আশি শতাংশই কৃষি খাতে কর্মরত। মোট কৃষিশ্রমের তেত্রিশ শতাংশই আসে তাঁদের সুবাদে, তাছাড়া স্বনিযুক্ত কৃষকদের আটচল্লিশ শতাংশই মহিলা। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের আঠারো শতাংশ কৃষি পরিবারের পুরোভাগে আছেন মেয়েরাই।
এই প্রতিবেদনটি মূলত ২০১২ সালের ২৬মে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার দ্য ক্রেস্ট এডিশনে প্রকাশিত হয়েছিল।
অনুবাদ: জয়দীপ ব্যানার্জী
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী


