আলতো হেসেছিল আমিনা সেদিন। মসজিদ লাগোয়া তার এক-কামরার এই বাড়িটার শ্যাওলা ধরা দেওয়ালে নতুন মেহমান দেখা দিয়েছে যে! মেহমান আর কেউ নয়, ছোট্ট একখানা অশ্বত্থ চারা। তাকে উপড়ে ফেলতে কিছুতেই মন চাইল না আমিনার। বেশ কিছুদিন হতে চলল চৌকাঠ ডিঙোয় না মেয়েটা, চার-দেওয়ালের মাঝে দিনের পর দিন আটকে রেখেছে নিজেকে। পেটের বাচ্চাটা নষ্ট হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে শরীরটা তার সুস্থ হয়ে উঠছে বটে, তবে যে ঘটনাটির জেরে আমিনা গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল, সেটা তাকে ভিতর থেকে খানখান করে দিয়ে গেছে। এ যেন কেয়ামতের ছায়ায় বেঁচে থাকা, মাথা গোঁজার আর কোনও ঠাঁইও যে ছিল না। সদ্যোজাত এই পাতাটা হৃৎপিণ্ডের আকারের, কচি কলাপাতা রং। সাম্প্রতিক কালে আমিনার ত্রিসীমানায় নরম মোলায়েম বলতে এই পাতাটাই আছে কেবল।
আরও একটা জিনিস আছে, পাতাটা যে ক্বিবলার দিকে মুখ করেই জন্ম নিয়েছে — এটা কি নেহাতই সমাপতন? নাকি গূঢ় কোনও সত্যের হাতছানি? আমিনা কিছুতেই আঁচ করে উঠতে পারে না।
একমাস যেতে না যেতেই আমিনা খেয়াল করে তার দেওয়ালের ফাটলটা আরও চওড়া হচ্ছে, আরও ছড়িয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অশ্বত্থ চারাটা। ইতিমধ্যেই কাণ্ডটা এক হাত লম্বা হয়ে গেছে, সরু সরু শাখা-প্রশাখায় দেখা দিয়েছে আরও খানকতক সাদাফরঙা পাতা। তা সত্ত্বেও না ফাটল, না গাছ, কোনওকিছুতেই আমিনা আর বিরক্ত হচ্ছে না। মনের ভিতর গুটিগুটি পায়ে ফিরে এসেছে শান্তি। দাঙ্গাটাও থেমেছে, পথঘাট জুড়ে ফিরে এসেছে জিন্দেগির চেনা ছক। ঘরে বসেই সেলাই-ফোঁড়াইয়ের তোলা-কাজ শুরু করেছে মেয়েটি। থেকে থেকেই সে একলা পায়ে কামরার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, আপনমনে বকবক করে, যেন এতযুগ পথে তার দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনার মতো কেউ এসেছে।
আমিনা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি দেওয়ালের বাইরের দিকে অশ্বত্থটা বাড়তে বাড়তে কেমন দৈত্যাকার হয়ে উঠেছে। ভিটের ওপারে সড়ক, ওদিকের পাড়ায় অন্য মানুষের বাস। আমিনার বেরাদরির লোকজন ওদের সঙ্গে আজকাল আর তেমন কথাবার্তা কয়-টয় না। আমিনার চোখের আড়ালে কে যে তার দেওয়ালের পিছনে খানকতক পবিত্র পাথর রেখে গেল, কখন যে এত কেরামত-আজুবা প্রকাশ পেল, ওপাড়ার মোড়লরা কখন যে সালিশি-মাতব্বরি করে ঠিক করল চারাগাছটা ঘিরে আলাদা একখান ইমারত তোলার — মেয়েটা টেরই পেল না। যেন অশ্বত্থ চারা তারই বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। আরে বাবা, এতো যে-সে গাছ নয়, স্বয়ং বৃক্ষদেবতা! ওঁ দারুব্রহ্ম! একে উপড়ানোর কথা ভাবাও পাপ। ততদিনে চারাগাছ ঘিরে নানান গপ্পও চাউর হয়ে গেছে: এমন একখান জায়গায় এরকম একটা গাছ, এর শিকড়ে-বাকড়ে বিরাজমান খোদ বিষ্ণু। নাকি ব্রহ্মা? দেওয়ালে সাঁটা নোটিশটা পড়তে পড়তে নিজেই নিজের মূর্খতায় গাল পাড়তে লাগল আমিনা...


