আর এসবের পাশাপাশি, প্রত্যাশিতভাবেই চড়চড়িয়ে বাড়ছে অসাম্যের পারদ। ভারতে এই মুহূর্তে ডলারের নিক্তিতে বিলিয়নেয়ার আছে ২১৭ জন; ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে তাদের সম্মিলিত সম্পদমূল্য ছিল (ফোর্বস-এর হিসেবে) ১,০৪১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ব্যাপারটা বিলিয়ন ছাড়িয়ে ট্রিলিয়নে পৌঁছে গেছে। ভারতের কৃষিখাতের বাজেট ১৭.৯১ বিলিয়ন ডলার; তার প্রায় ৫৮ গুণ হবে পূর্বোক্ত সংখ্যাটা। দেশের গোটা বাজেট ৫৬২ বিলিয়ন ডলার; তার প্রায় ১.৮ গুণ। ভেবে দেখুন: দেশের ২১৭ জন ব্যক্তির (জনসংখ্যার ০.০০০০১৫ শতাংশ) হাতে জমা হয়েছে আমাদের জাতীয় মোট আয় বা জিডিপি-র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ।
১৯৯১ সালের পরের দশকগুলিতে ক্রমান্বয়ে অবক্ষয়ের পথে গেছে চাষিদের জীবনধারণের সহায়ক নীতিমালা। যেমন ধরুন, সরকারি-নিয়ন্ত্রণে থাকা বাজার বা মান্ডিগুলির গুরুত্ব কমে আসা। কিংবা, সরকারি ক্ষেত্রের পরিকল্পনামাফিক, বিধ্বংসী অবমূল্যায়ন, যা কৃষিক্ষেত্র তথা কৃষকদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তার জেরে টান পড়েছে খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সহজলভ্যতার উপরেও।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এককালে জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত, কাফকার উপন্যাসের মতো দুঃস্বপ্নগহ্বরে পড়ে তারা আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট কৃষিবাণিজ্যের পরীক্ষাগার। চাষিদের হাত থেকে পরিকল্পনামাফিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বিকল্প, লক্ষ লক্ষ চাষি বাধ্য হয়েছেন নতুন-পুরোনো সাহুকার বা মহাজনদের থেকে ধার করতে। চাষিদের প্রাপ্য দাম কমেছে, কিন্তু উপভোক্তাদের কেনার দাম বিস্ফারিত হয়েছে ক্রমশ। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বিদর্ভ অঞ্চলে তুলো চাষের খরচের খতিয়ানে একবার চোখ বোলালে দেখা যাবে, এই সময়কালের মধ্যে এক একর তুলো চাষের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ তথা সার্বিক চাষের খরচ বেড়েছে ২৫০-৩০০ শতাংশ, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু চাষিদের আয়? চাষের খরচ, বিশেষ করে বীজের দাম যেমন বিদ্যুৎগতিতে বেড়ে চলেছে তার তুলনায় চাষ থেকে আয় বেড়েছে নিতান্তই সামান্য, যদি আদৌ বেড়ে থাকে।
আয়ের কথাই ধরি? জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে বা এনএসএস) ৭৭তম সংস্করণ, যাতে চাষিবাড়িগুলির শেষতম তথ্য ধরা আছে, তাতেও দেখাচ্ছে যে চাষিবাড়ির গড় মাসিক আয় হল ১০,২১৮ টাকা। সংগঠিত ক্ষেত্রে এমন একটাও চাকরি দেখাতে পারবেন যার মাসিক বেতন এর অন্তত দ্বিগুণ নয়? মাথায় রাখতে হবে, এটা কিন্তু একজনের আয় নয়, গোটা পরিবারের আয়। ২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পাঁচ বছরের মধ্যে চাষিদের আয় দ্বিগুণ করে দেবে, মনে আছে? আদতে ২০১২-১৩ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের মধ্যে চাষ থেকে আয় ১০ শতাংশ কমে গেছে। চাষিবাড়িগুলিতে এখন মজুরি, চাকরির বেতন, গবাদি পশু ইত্যাদি থেকে আয় হয় চাষের আয়ের তুলনায় বেশি।
প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদরা যেমন দেখিয়েছেন, আমাদের দেশে জিনিসের দামের বিশ্বায়ন হয়েছে, আর উপার্জনের ক্ষেত্রে হয়েছে ভারতীয়করণ।
২০২৪ সালে এসে আমরা জানি, এখনও পর্যন্ত ৪,০০,০০০ চাষি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীতিপঙ্গুতা-জনিত কারণে হতাশাতাড়িত হয়ে। এই সংখ্যাটা সরকারি হিসাব, এবং প্রত্যাশিতভাবেই বাস্তব সংখ্যার চেয়ে অনেক অনেক কম।