মাত্র ১২ বছর বয়সেই পরিবারের কর্তা হয়ে বসেন মীরামনভাই চাওড়া। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বাড়ির বড়ো ছেলে হিসেবে, সংসারের বাকি সব দায়দায়িত্বের সঙ্গে দুই ভাই ও দুই বোনকে মানুষ করার ভারও তাঁর ওপর এসে পড়ে। অগত্যা মৃৎপাত্র তৈরি করে স্থানীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করা শুরু করেন তিনি। কিছু ব্যবসায়ী আবার সেইসব সামগ্রী তাঁর কাছ থেকে কিনে দূর-দূরান্তের গ্রামেও নিয়ে যেতেন বিক্রিবাটার জন্য। আশেপাশের ১০টি গ্রামের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র কুম্ভকার।
বহু দশক পার করে মীরামন আজও তাঁর কুমোরের চাকটির পাশে গিয়ে বসেন, হাতের নিপুণ চাপে গড়েন হাঁড়িকুড়ি। এই লুপ্তপ্রায় কারিগরির পেছনে এক ঘণ্টা খেটেখুটে একটি পাত্র গড়ার বিনিময়ে তিনি পাবেন ১০০ টাকা। দিনে প্রায় চার ঘণ্টা কাজ করেন, শেষ পর্যন্ত তৈরি হওয়া জিনিসগুলো কতটা কী বিকোচ্ছে তার ওপরেই তাঁর আয় নির্ভর করে। দিন ভালো গেলে, চার-পাঁচখানা পাত্র বিক্রি করে প্রায় ৪৫০ টাকার মতো রোজগার হয়। কিন্তু এমন দিন বড়ো একটা আসে না।
“আগে মানুষজন চাল-ডাল, কাপড় কিংবা জুতো দিয়ে মাটির পাত্রের দাম মেটাত। সেইসব দিনই ভালো ছিল,” সুদূর অতীত জীবনের কথা মনে পড়ে তাঁর। জমিজমা তো কিছু ছিল না, সংসারের বেশিরভাগ রসদ তাঁকে এভাবেই জোগাড় করতে হত।
মীরামনের জন্ম গুজরাটের পোরবন্দর জেলার মেখাড়ি গ্রামে। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পর, সবাইকে নিয়ে জুনাগড় জেলার চাখোয়া গাঁয়ে গিয়ে ওঠেন। তখনও নবাবী শাসনাধীন ছিল জুনাগড়। “হেঁশেলেও কিন্তু এই শর্মার কদর ছিল। উৎসব-অনুষ্ঠানে খাবারদাবার পরিবেশনের বেলায় খোদ নবাবদের কাছ থেকে ডাক পড়ত আমার,” উৎসাহভরে বলে উঠলেন তিনি।
নবাবদের জন্যেও মাটির পাত্র তৈরি করতেন মীরামন। “যখনই নবাব জামালের কালে বাবির ডাক আসত, ভোর ভোর রওনা হয়ে পড়তাম আর ৭১ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে সন্ধ্যার দিকে পৌঁছতাম জুনাগড়ে। বাড়ির একমাত্র রোজগেরে তো, ১২ আনা দিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটারও ক্ষমতা ছিল না। দুই বোনের বিয়েও দিতে হত তখন,” জানালেন তিনি।
মীরামনের যদ্দূর স্মরণ পড়ে, ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় ৩৩ বছরের যুবক ছিলেন তিনি। সেই হিসেবে তো তাঁর বয়স এখন ১০০ বছরেরও বেশি! এই বয়সেও মাটির কাজ করছেন কীভাবে? “প্রত্যেকেই একটা না একটা কাজ করার জন্য জন্মায়। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সেই কাজ তাদের করতেই হয়। এমনভাবে, যেন সেই কাজটা কেবল তাদেরই করার কথা। আমার শৈশব, যৌবন, হাজার দায়দায়িত্বের দিনগুলো — সবই এই শিল্প, এই সৃষ্টি নিয়ে কেটেছে। এখন কী বলে থামি? এই শিল্পকে সঙ্গে করে সারাটা জীবন বেঁচেছি, এই শিল্পকে সঙ্গে নিয়েই মরব,” বলতে বলতে মীরামন আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর ছোট্ট উঠোনে, মাটির জিনিস তৈরির রকমারি সরঞ্জাম আর যন্ত্রপাতির এক নজরকাড়া সম্ভার সেখানে। সাক্ষাৎ মিউজিয়াম, সন্দেহ কী!








