প্রতি মাসের ১৪ তারিখে একটি গ্রামীণ ‘আদালতে’ বিচার-বিবেচনা করে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ভান্ডুরি গাঁয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের দেওয়া একটি জমিতে এই ‘আদালত’ বসে।
“আদালতের কাজকম্মের খরচ বাবদ ২৫ টাকা দিয়ে একজন ভুক্তভোগী মামলা দায়ের করতে পারেন,” হীরাবেন জানালেন। “আমরা অভিযুক্তকে একটা নোটিশ পাঠাই আর শুনানির একটা মোটামুটি তারিখ জানিয়ে দিই। খুনের হুমকি থেকে শুরু করে আরও নানান ঝামেলায়ও পড়তে হয় তার জন্য। কিন্তু একটা ভালো কাজ করতে গেলে, সাহস আপনা থেকেই জুটে যায়।” যে কোনও ঘটনায়, দু'পক্ষের কথা শোনার পরে কমিটি এমন রায় দেয় যা উভয়ের কাছেই সন্তোষজনক। আধিকারিক পদ-টদ নেই তাঁদের কারও, লোকজনকে বুঝিয়েবাঝিয়ে, মধ্যস্থতা করে আর বৃহত্তর গোষ্ঠীস্তরে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রায়দান করেন তাঁরা। কোনও কোনও সময় এই সব আলোচনা একটা গোটা দিন এমনকি একাধিক দিন ধরেও চলে।
যদি কোনও অভিযুক্ত এই ‘রায়’এর বিরোধিতা করেন, যা কিনা প্রায়শই ঘটে, তখন কমিটিকে পুলিশের সাহায্যে রায় বহাল করতে হয় কিংবা মামলাটি জেলা আদালতে নিয়ে যেতে হয়। কোনও মামলা ভালোয়-ভালোয় মিটে গেলে ‘মক্কেল’ মামলা সামলানোর ফি বাবদ ৫০০ টাকা দেন আর পুলিশ স্টেশন বা আদালতে যাতায়াতের খরচাপাতিও তাঁকেই মেটাতে হয়। ফিয়ের ৫০০ টাকা কমিটির অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে। যেসব অভিযোগকারীর কোনও রকম টাকাপয়সা দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না, তাঁদের টুকটাক খরচ-খরচা বাবদ ওই টাকা ব্যয় হয়।
ন্যায় হাসিলের লড়াইয়ে সমিতির দক্ষতা যে কতখানি, গল্পচ্ছলে শোনা নানান ঘটনা তার সাক্ষ্য দেয়। “একবার আমাদের একটা কেসে, একজন [নির্মাণক্ষেত্রের এক অবস্থাপন্ন ঠিকেদার] তাঁর বউকে ঠকাচ্ছিল,” বেশ মনে পড়ে হামিলবেনের। “তার বেইমানি নিয়ে প্রশ্ন তুললে সে বউকে পিটিয়ে, দুই বাচ্চা সমেত বউটাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে চলে যায়।” সমিতির পুরনো এক মক্কেল সেই ভদ্রমহিলাকে রাজি করেছিলেন যাতে তিনি ন্যায় সমিতির কাছে সাহায্য নেন। নালিশ করলে পাছে স্বামী আরও মারধোর করে, সেই ভয়ে প্রাথমিকভাবে ইতস্তত করলেও পরে সমিতির কাছে এসেছিলেন তিনি।
তারপর সেই লোকটিকে তলব করা হয়। আসতে রাজি হওয়া তো দূর অস্ত, উপরন্তু সমিতির সদস্যদের পেছনে উঠেপড়ে লেগেছিল সে। “গুন্ডা নিয়ে আমাদের অফিসে এসে হুমকি দিয়ে যেত, রাত্রিবেলা আমাদের বাড়িতে পাথর ছুঁড়ত। প্রথমে তো ভয় পেয়ে গেছিলাম, তারপর পুলিশ আমাদের সাহায্য করেছিল,” হীরাবেন জানালেন।
সমিতির মহিলারাও অবশ্য ছাড়ার পাত্রী ছিলেন না। জোর কদমে মামলা চালিয়ে যান তাঁরা, আরও তিনটি সমন পাঠান অভিযুক্তকে। এরপরেও লোকটি হাজিরা না দিলে, সমিতি পুলিশের দ্বারস্থ হয় ও শ্রীযুক্ত ঠিকেদার মশাইকে মামলার শুনানিতে হাজির থাকতে বাধ্য করে।
পক্ষপাতহীন ও সংস্কারমুক্ত থাকার চেষ্টায় কখনও কসুর করে না এই সমিতি। উভয়পক্ষকে তাই একত্রে সামনা-সামনি নিজেদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। শুনানির পর, প্রত্যেক পক্ষকেই বলা হয় যাতে তাঁরা বিভিন্ন বিকল্প পন্থা, বিশেষত তাদের সন্তান সংক্রান্ত দিকগুলি - ভেবেচিন্তে দেখেন। এই ঠিকেদারের মামলাটা নিয়ে বিশদ আলোচনার পরে সমিতি স্থির করেছিল যে বিবাহ-বিচ্ছেদের পর কনট্রাক্টরকে তার রাজকোটের একটি বাড়ি ও আড়াই লক্ষ টাকা স্ত্রীকে দিতে হবে।
কিন্তু রায় পালন করাতে গিয়ে প্রায়ই আরও ঝামেলা পড়তে হয় তাঁদের। হীরাবেন বললেন, “এই মামলাটাতেই, আমরা সেই মহিলাকে নিয়ে তার রাজকোটের বাড়িতে যাই, ওর বরের আটকানো তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকি ও লোকটিকে জানিয়ে দিই। সেই রাতেই সে ব্যাটা গ্রামে এসে হাজির হয়, আর স্ত্রীকে নির্দয়ভাবে মারধোর করে। মেয়েটা তার বাচ্চাদের নিয়ে কোনও মতে পালিয়ে গিয়ে, আমাকে ফোন করে। আমি রাজকোটের সাব-ইন্সপেক্টরকে ব্যাপারটা দেখতে অনুরোধ জানাই।”
এই ধরনের সমস্যা মোকাবিলার খাড়াই পথখানা পার হতে কম ঝক্কি পোহান না সমিতির মহিলারা।নিজেদের পরিবার থেকে আসা বাধাগুলোও পেরোতে হয় বৈকি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে কয়েক বছর থাকাকালীন, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পগুলি তাঁদের গ্রামে বলবৎ করার মতো যেসব কাজ তাঁরা করেন, তাও প্রাথমিকভাবে মদত ও বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছিল তাঁদের। আর ধীরে ধীরে, নানান বিবাদের সুষ্ঠু সমঝোতা করা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব মেটানো ও অন্যান্য সমস্যার সফল সমাধান – তাঁদের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেক গুণ।