বীড: নিজের ছোট্ট জোয়ারখেতটা আঁকড়েই ছিল তাঁর সমস্ত আশা-ভরসা । গত অক্টোবরের খরায় তুলোর ফসল শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ার পর একটু একটু করে সযত্নে জমি তৈরি করেন সন্দীপ শিণ্ডে। কিন্তু গত সপ্তাহে নতুন ফসল ঘরে তোলার ঠিক কয়েকদিন আগেই তোড়ে বৃষ্টি নামল। জোয়ার গাছগুলো লুটিয়ে পড়ল কাদামাটিতে, কালো হয়ে গেল শস্য। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, ২৭ বছর-বয়সি সন্দীপ, পাটোড়া তালুকে নিজের জমিতেই দাঁড়ানো একটা গাছে নাইলন দড়ি বেঁধে আত্মঘাতী হলেন।


Jalna, Maharashtra
|THU, SEP 25, 2025
মহারাষ্ট্র: কৃষক আত্মহত্যার হারে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি
কৃষক আত্মহননের হারে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির 'সরকারি' তথ্যটা মূলত রাজস্ব দপ্তরের থেকে পাওয়া, জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) হিসেবের সঙ্গে একে গুলিয়ে না ফেলাই ভালো, যে হিসেব এলে অবশ্য সংখ্যাটা এর চেয়ে অনেক বেশিই দাঁড়াবে
Author
Translator

Priyanka Kakodkar
রুক্ষ-অনুর্বর এ তল্লাটে গত তিন বছরে একবারও ভালো ফসল ওঠেনি শিণ্ডের। ১.২ লক্ষ টাকা ঋণের বোঝা চেপেছিল ঘাড়ে। খরা আর অকালবৃষ্টির ধাক্কায় লোকসান সামাল দেওয়ার সুযোগও ঘটেনি আর। “নিজের ধারদেনা নিয়ে খুব চিন্তায় থাকত, বলত বাইরে গিয়ে কাজ খুঁজবে,” জানালেন পারিবারিক বন্ধু রাজাভাউ দেশমুখ।
সদ্য বিধবা স্ত্রী শোভা এখন চার বছরের ছেলে আর এক বছরের কন্যাকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। “বাচ্চাদের দুধ জোগাড় করার সামর্থ্যও নেই আমার,” দৃশ্যতই ভেঙে পড়েন তিনি।

Priyanka Kakodkar
একে কৃষক আত্মহত্যা মহামারির আকার ধারণ করেছে এ রাজ্যে, তার ওপর ব্যাপক খরা আর খামখেয়ালি বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির জেরে ক্রমশই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন কৃষকেরা। কতবার পরপর দু'দফার ফসলও নষ্ট হয়েছে এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে।
রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে এই জোড়া বিপর্যয়ের ধাক্কায় কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা আগের বছরের একই সময়সীমার নিরিখে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে মোট ৯৭৫টি কৃষক আত্মহত্যার খবর আসে রাজ্যের কাছে। আর ওই বছরের অগস্ট মাস থেকে খরা জেঁকে বসার পর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেই সংখ্যাটা এক লাফে ১৩৭৩ হয়ে যায়।
খরায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম মারাঠওয়াড়ায় একই সময়কালে কৃষক আত্মহত্যা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ, সংখ্যার হিসেবে ৮৫ শতাংশ। এই অঞ্চলের প্রত্যেকটা গ্রামকেই খরা-কবলিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
আওরঙ্গাবাদের বীড জেলার জয়কওয়াড়ি বাঁধের কাছে গেওরাই গ্রামে বড়ো বড়ো জমি-মালিকরাও আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। গঙ্গাধর শেণ্ডগে যেমন দুই সপ্তাহ আগে আত্মঘাতী হন, ১৮ একরের খেত ছিল তাঁর। “আমাদের গোটা খরিফ ফসল নষ্ট হয়ে গেল। রবি ফসল তো বুনতেই পারলাম না,” জানালেন তাঁর ছেলে মহাদেব শেণ্ডগে । সারা রাজ্য জুড়েই রবিশস্যের চাষে প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
আধিকারিকদের মতে মহারাষ্ট্র এখন তিন রকম খরার সম্মিলিত ধাক্কায় কাবু। “বৃষ্টিপাতের ঘাটতি থেকে আবহাওয়াগত খরা হয় আর ভূগর্ভস্থ জলের হ্রাস থেকে জলভিত্তিক খরা। তাছাড়া ফলন কমা মানে তো চাষবাসের খরাও চলছে,” বুঝিয়ে বলেন আওরঙ্গাবাদের বিভাগীয় কমিশনার উমাকান্ত দঙ্গট।
আবহাওয়ার এহেন খামখেয়ালিপনার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন তিনি। “বর্ষাকালের দেরিতে আগমন আর অকালবিদায়, এক এক পশলা বৃষ্টিবাদলার মাঝে দীর্ঘ বিরতি, খাপছাড়া শিলাবৃষ্টি— সবই জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণ,” বেশ বোঝেন তিনি।
কৃষকের অঙ্ক মেলে না
প্রাকৃতিক খামখেয়ালের কথা যদি ছেড়েও দেওয়া হয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন কৃষি অর্থনীতির ঝোঁকটাও বরাবরই চাষিদের বিপক্ষে, এমনকি সুদিনেও তাই। “খরার দরুণ তো ফলন কমেইছে। চাষের চড়া খরচাপাতি আর ফসলের কম দাম পাওয়ার ব্যাপারটাও এর সঙ্গে যোগ করে দেখুন। কৃষক বাঁচবে কী করে?” প্রশ্ন ছোঁড়েন কৃষি-অধিকার কর্মী বিজয় জওয়ানদিয়া।
এক কুইন্টাল তুলো উৎপাদনের ন্যূনতম খরচ ৫,২০০ টাকা। গত বছর ওটুকুরই বাজারদর ছিল ৫,০০০ টাকা, অর্থাৎ লাভ-লোকসানের গল্প ছিল না আলাদা করে। কিন্তু এখন দাম পড়তে পড়তে ৩,৬০০–৩,৮০০ টাকায় এসে ঠেকেছে, সমস্যাটা খোলসা করেন জওয়ানদিয়া।
তার ওপর আছে উৎকট সব নীতি। এই খরাপ্রবণ অঞ্চলে জলখেকো আখচাষকে উৎসাহ দেওয়ায় যেমন জলের সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। মারাঠওয়াড়ায় ২.৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়, ৬১টা চিনি কল চলে জোরকদমে।
“এক হেক্টর আখচাষে যে পরিমাণ জল লাগে, তাতে ৮ হেক্টর রবি জোয়ার সেচ হয়ে যায়। এমন রুখাশুখা জমিতে এইসব ফলানো একদম উচিত নয়। রাজ্যের মোট জমির ৫ শতাংশ দখল করে আখচাষ, কিন্তু সেচের জলের ৬০ শতাংশ কাজে লাগিয়ে নেয়,” বুঝিয়ে দেন মারাঠওয়াড়া স্ট্যাটিউটরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য প্রদীপ পুরন্দর।
মারাঠওয়াড়ায় সেচব্যবস্থা এখনও রীতিমতো অপ্রতুল। যেটুকু যা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল সেটাও সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি। বিভাগীয় কমিশনারের হিসেব অনুযায়ী, এখানে ১০ লক্ষ হেক্টর জমির জন্য সেচের বন্দোবস্ত করা হলেও ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৩ লক্ষ হেক্টর।
সেচকাজের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকরা ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বোরওয়েল ও টিউবওয়েলের ওপর, যার ফলে ভৌমজল ব্যবহার হয়ে চলেছে যথেচ্ছ। এই অঞ্চলের অধিকাংশ তালুকে গত পাঁচ বছরের তুলনায় ভূগর্ভস্থ জলের স্তর অনেকটা নেমে গেছে বলে খবর। অতএব জলসংকট বাড়ছে। মারাঠওয়াড়ায় ঘনিয়ে উঠছে দুর্দিনের মেঘ।
ছবি: শেখ আজিজ
রিপোর্ট ৪: এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ২২ মার্চ ২০১৫ সংখ্যায়
এই সিরিজের অন্যান্য প্রতিবেদন:
রিপোর্ট ১: Nearly 80000 homeless elders go hungry
রিপোর্ট ২: Drought hits 90 lakhs farmers in Maharashtra
রিপোর্ট ৩: Kharif crops hit by drought pulses take a maha pounding
রিপোর্ট ৫: Bitter Harvest - Where villagers dig for hours to fill a pot
রিপোর্ট ৬: Drought migration forces aged to toil as farm hands
রিপোর্ট ৭: The man with 48 borewells in drought-hit Marathwada
রিপোর্ট ৮: Maharashtra's drought-hit farmers without bank accounts denied aid
রিপোর্ট ৯: Maharashtra govt says mulling farmer insurance as opposition cites TOI’s suicide reports
রিপোর্ট ১০: Study: Agri-corporates, not farmers, hog loans
রিপোর্ট ১১: Direct loans below Rs 25,000 to farmers plunge to 4.3% from 23%
রিপোর্ট ১২: Only 12% potential of Maharashtra’s 70,000 small dams used
রিপোর্ট ১৩: Unseasonal rain: 601 farmer suicides in Maharashra in just 3 months
রিপোর্ট ১৪: 'Only 3 Maharashtra farmers ended life due to unseasonal rain'
রিপোর্ট ১৫: State government's logic for its low farmer suicide count: Only 3 blamed rains
রিপোর্ট ১৬: Beef banned, but no state-run cow shelters in sight
অনুবাদ: সৌম্যদীপ ঘোষ
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
Donate to PARI
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/40-rise-in-farmer-suicides-in-maharashtra-bn

