চিকনপাড়ায় রাত সাড়ে ১০টার সময়ে শুরু হল জাগরণ তখন গোটা পাড়া ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু সনদের বাড়িতে তখন নামগান শোনা যাচ্ছে।

প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি মদুরের উপরে বসে ছিলেন কালু জঙ্গলি। তিনি পাশের পাঙ্গরি পাড়া থেকে এই অনুষ্ঠানটি করতে এসেছেন। ইট আর মাটির বাড়ির সামনের ঘরে ভিড় করেছেন কা ঠাকুর আদিবাসী গোষ্ঠীর বহু অতিথি। তাঁরা কেউ মেঝেতে বসে আছেন, কেউ প্লাস্টিকের চেয়ারে। এসেছেন ভানি দেবীর উদ্দেশে ভক্তিমূলক গান আর সারা রাতের প্রার্থনা অনুষ্ঠান এই জাগরণ-এ যোগ দিতে।

ঘরের মাঝখানে রাখা রয়েছে পূজার উপকরণ। বসে রয়েছেন পঞ্চাশ বছরের কালু। পূজার জিনিসের মধ্যে রয়েছে ধান, একটা লাল কাপড়ে (স্থানীয় ভাষায় ওরমাল) ঢাকা তামার ঘটের উপর রাখা আছে একটি নারকেল, আর রয়েছে কিছু ধূপকাঠি।

কালুর কাজে সাহায্য করছিলেন জয়িত্য দিঘা। তিনি একজন ভগত অর্থাৎ পারম্পরিক আরোগ্যকারী। থাকেন চিকনপাড়ায়। তিনি বলছেন, ‘‘একেবারে শেষ পর্যায়ে, যখন ভগতের ওষুধ রোগীর উপর প্রভাব ফেলেছে তখন এবং কুনজর তাড়াতে এই অনুষ্ঠান করা হয়।”

Kalu Jangali (left, in a white vest)  had confirmed the diagnosis – Nirmala (centre) had jaundice. But, he said, 'She was also heavily under the spell of an external entity', which he was warding off along with fellow bhagat Jaitya Digha during the jagran ceremony in Chikanpada hamlet
PHOTO • Shraddha Ghatge
Kalu Jangali (left, in a white vest)  had confirmed the diagnosis – Nirmala (centre) had jaundice. But, he said, 'She was also heavily under the spell of an external entity', which he was warding off along with fellow bhagat Jaitya Digha during the jagran ceremony in Chikanpada hamlet
PHOTO • Shraddha Ghatge

কালু জঙ্গলি (বাঁদিকে, সাদা গেঞ্জি পরা) নিশ্চিত করে বলেছেন — নির্মলার (মাঝে) জন্ডিস হয়েছিল। কিন্তু তিনি এও বলেছিলেন, ‘তাঁর ওপর বাইরের কোনও শক্তি প্রভাব ফেলেছিল’, যা তিনি সঙ্গী ভগত জয়িত্য দিঘার সঙ্গে চিকনপাড়া জনপদে ‘জাগরণ’ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তাড়াচ্ছিলেন

১৮ বছরের রুগ্ন নির্মলা মেঝেতে বসেছিলেন। তাঁর পরনে ঠিল পুরনো নীল ম্যাক্সি আর একটা শাল। শান্ত ভাবে ঘাড় নাড়ছিলেন কালুর কথায়। জয়িত্য স্টিলের থালায় ধানগুলিকে পরীক্ষা করে দেখছিলেন, ‘‘নির্মলাকে পরে আবার কোনও খারাপ শক্তি কষ্ট দেবে কি না, তারই উত্তর খুঁজছি পূর্বপুরুষদের কাছে।”

নির্মলার বাবা শত্রু সনদ এক একরেরও কম জমিতে ধান চাষ করেন। তিনি বলেন, ‘‘ওর খুব জ্বর আসছিল, খিদে ছিল না, সারা শরীরে ব্যথা ছিল। আমরা সেপ্টেম্বরের গোড়ায় ওকে মোখাদা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। জন্ডিস ধরা পড়েছিল। কিন্তু ওরা যা ওষুধ দেয়, তাতে কাজ হয়নি। বরং অবস্থা আরও খারাপ হয়েছিল। ওর ওজম কমে গেছিল, ঘুম হচ্ছিল না। সারাক্ষণ ভয় পেত, উদ্বিগ্ন ও ক্লান্ত থাকত। আমাদের ভয় ছিল, কেউ নিশ্চয়ই ওর উপর কিছু তুকতাক করেছে। তখনই আমরা ওকে কালুর কাছে নিয়ে যাই।”

শত্রু আরও জানালেন, ভগত তাকে একটা তাইত (রুপোর মাদুলি) দিয়েছে, সেটিতে ধূপের ছাই আর ওষধির গুঁড়ো মেশানো রয়েছে, যা সে কয়েক দিন ধরে খাচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘সেটা কাজ করেছে এবং তাই আমরা এই জাগরণ-এর আয়োজন করেছি, যাতে ওর উপর পড়া কুনজর সম্পূর্ণভাবে চলে যায়।”

কালুও কিন্তু এই রোগনির্ণয় স্বীকার করে নিয়েছেন — হ্যাঁ, নির্মলার জন্ডিস হয়েছিল। কিন্তু, তিনি বলেন, ‘‘সেইসঙ্গে ও কোনও বাইরের শক্তির প্রভাবে ছিল।” কালু পা থেকে মাথা অবধি একটি দড়ি বেঁধে ওরমালের চারদিকে সামনে পিছনে দুলছিলেন, যাতে ‘অপশক্তি’ বিদায় নেয়।

ভগতরা প্রচলের থেকেও অনেক বেশি নির্ভর করেন ওষধি গুণসম্পন্ন শেকড়বাকড়ের উপর, বলেন, ‘কিন্তু যদি আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে চলে যায়, আমরা ওদের বলি চিকিৎসকের কাছে যেতে’

ভিডিও দেখুন: ভগত, আস্থা আর মানসিক টানাপোড়েনে চিকনপাড়া

সনদের পরিবারে ভগতদের নিমন্ত্রণ বা তাঁর পৌরহিত্য পালঘরের মোখাদ তালুকের চাস গ্রাম পঞ্চায়েতের এই পাঁচটি পাড়ায় বিরল নয়। মধ্য মুম্বই থেকে এটি প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে।

চাস গ্রামের কমলাকার ওয়ারঘাড়ে বলেন, ‘‘শুধু চাস নয়, মোখাদা তালুকের বেশিরভাগ গ্রামের মানুষই বিশ্বাস করে, কোনও অশুভ শক্তি, বা কুনজর বা কালাজাদুতে কারও উন্নতি থেমে যেতে পারে।” তিনি এই বিশ্বাসের যথার্থতা নিয়ে সন্দিহান, কিন্তু স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসের প্রতি সহানুভূতিশীলও। সনদের পরিবারের মতো, তিনিও কা ঠাকুর আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষ। স্থানীয় অনুষ্ঠানে ব্যান্ডে অর্গান, হারমোনিয়াম, কিবোর্ড বাজান। তিনি বলেন, ‘‘সাধারণত কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, বা তাদের কোনও কাজ হঠাৎ ব্যাহত হয়, কোনও কারণ খুঁজে না পেলে লোকে ভগতদের কাছে আসে। আর অসুস্থ হলে, ডাক্তার যদি রোগ ধরতে না পারে, তাহলেও তাদের দ্বারস্থ হয়।”

মোখাদায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণেই এই ভগতদের উপর মানুষের আস্থা অনেক বেশি। পাঁচটা পাড়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে রয়েছে চিকনপাড়া থেকে ২ কিলোমিটার দূরে চাস গ্রামে একটি সরকারি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

ওয়ারঘাড়ে, বলেন ‘‘প্রতি মঙ্গলবার ডাক্তার আসে। কিন্তু কখন তাকে পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত নয়। একজন সিস্টার রোজ আসেন, কিন্তু তিনি শুধু জ্বর, সর্দি, কাশির ওষুধটুকুই দিতে পারেন। ওষুধপত্র তেমন মেলে না, কোনও ইনজেকশন নেই, শুধু ট্যাবলেট। আশা সাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি যান, কিন্তু যদি কারও অবস্থা গুরুতর হয়, তাহলে আমাদের মোখাদায় [হাসপাতালে] যেতে বলে।”

Left: Nirmala's mother Indu, on the night of the the jagran, says she is relieved. Right: Kamlakar Warghade (here with his daughter Priyanka) of Chas village is sceptical but also sympathetic about the local belief systems
PHOTO • Shraddha Ghatge
Left: Nirmala's mother Indu, on the night of the the jagran, says she is relieved. Right: Kamlakar Warghade (here with his daughter Priyanka) of Chas village is sceptical but also sympathetic about the local belief systems
PHOTO • Shraddha Ghatge

বাঁদিকে: জাগরণের রাতে নির্মলার মা ইন্দু বললেন, তাঁর নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে। ডানদিকে: চাস গ্রামের কমলাকার ওয়ারঘাড়ে (তাঁর মেয়ে প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে) স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসের যাথার্থ্য নিয়ে সন্দিহান, একই সঙ্গে সহানুভূতিশীলও

নিউমোনিয়া, জন্ডিস, ভাঙা হাড়, দুর্ঘটনা বা সন্তান প্রসবের মতো বড়ো কিছু থাকলে ২৬০৯ জনসংখ্যা বিশিষ্ট  চাস গ্রামের মানুষ যান ১৫ কিলোমিটার দূরে, মোখাদা গ্রামীণ হাসপাতালে।

তার জন্য প্রায় ৩ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয় সব চেয়ে কাছের বাস স্টপে। কিছু কিছু জনপদ থেকে তা আরও দূরে। না হলে গোটা পরিবারের জন্য জিপ ভাড়া করতে হয়, যাতায়াতে ভাড়া পড়ে ৫০০ টাকা। মাঝে মাঝে বোলেরো গাড়ির খোঁজও করেন কেউ কেউ, যেখানে সিট প্রতি ভাড়া ১০-২০টাকা। কিন্তু সেগুলো সব সময়ে পাওয়া যায় না।

কমলাকার বলেন ‘‘এখানকার বেশিরভাগ গ্রামবাসীই ছোটো চাষি বা খেতমজুর। দিনে সবচেয়ে বেশি হলে ২৫০ টাকা আয়। হাসপাতালের খরচ আছে। সেখানে শুধু যাতায়াতের জন্য ৫০০ টাকা খরচ করা তাদের জন্য মুশকিল।”

আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই ফাঁকটাই পূরণ করেন ভগতরা। এই সমাজ চিরাচরিতভাবেই আরোগ্যেলাভের জন্য তাঁদের প্রতি বিশ্বাস করেছে। পেট ব্যথা, জ্বরের মতো ছোটোখাটো অসুস্থতায় আদিবাসী অধ্যুষিত চাস গ্রামের কা ঠাকুর, মা ঠাকুর, কোলি মহাদেব, ভার্লি, কাতকারি সম্প্রদায়ের মানুষরা ভগতদের কাছেই যান। শুধু তাই নয় ‘কুনজর’ থেকে তাঁদের রক্ষা করার জন্য ভগতদের উপরই ভরসা করেন তাঁরা।

Chas village (left): the Sanad family’s invitation to the bhagats is not unusual in the five padas (hamlets) of Chas gram panchayat. The local PHCs are barely equipped, and Mokhada Rural Hospital (right) is around 15 kilometres away
PHOTO • Shraddha Ghatge
Chas village (left): the Sanad family’s invitation to the bhagats is not unusual in the five padas (hamlets) of Chas gram panchayat. The local PHCs are barely equipped, and Mokhada Rural Hospital (right) is around 15 kilometres away
PHOTO • Shraddha Ghatge

চাস গ্রাম (বাঁদিকে): ভগতদের কাছে সনদ পরিবারের আমন্ত্রণ চাস গ্রাম পঞ্চায়েতের পাঁচটি পাড়ায় বিরল নয়। স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অপ্রতুল আর মোখাদা গ্রামীণ হাসপাতাল (ডানদিকে) ১৫ কিলোমিটার দূরে

বেশিরভাগ ভগতই স্থানীয় (এবং সকলেই পুরুষ)। যাঁরা তাঁদের কাছে সাহায্যের জন্য আসেন, তাঁদের খুবই ঘনিষ্ঠ, পরিচিত। কালু জঙ্গলি, যিনি নির্মলার আরোগ্যের কাজ করছিলেন, তিনিও কা ঠাকুর সম্প্রদায়ের। তিরিশ বছর ধরে এই কাজ করছেন। জাগরণের রাতে তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘‘এই আচার অনুষ্ঠানগুলো আমাদের আদিবাসী সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্মলার জন্য, আমরা কাল সকালে একটা মোরগ বলি দেব, এবং তার সম্পূর্ণ আরোগ্যের জন্য প্রার্থনা করব। যখন বুঝতে পারি, কোনও অশুভ শক্তি রোগীকে ঘিরে আছে, তখনই আমরা এই আচারটা পালন করি। অশুভ শক্তিকে তাড়ানোর মন্ত্রও আমরা জানি।”

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভগতরা বিভিন্ন ওষধি গুণ সম্পন্ন শেকড়বাকড় দেন। কালু বলছেন, ‘‘আমরা জঙ্গলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ফুল, পাতা, ঘাস, গাছের ছাল নিয়ে আসি। তারপর আমরা সে সব দিয়ে ক্বাথ বানাই, মাঝে মাঝে শেকড়বাকড় পুড়িয়ে, সেই ছাইটা রোগীকে খেতে দিই।এটা সাধারণত কাজ করে, যদি রোগীর চার পাশে কোনও অশুভ শক্তি না থাকে। কিন্তু যদি আমাদের হাতের বাইরে চলে যায় অবস্থা, আমরা তখন তাদের ডাক্তারের কাছে যেতে বলি।”

কালু যেমন ডাক্তার, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাদির প্রয়োজনকে অস্বীকার করেন না, তেমনই ডাক্তাররাও ভগতদের উড়িয়ে দেন না। চাস থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ওয়াশালা গ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ড. পুষ্পা গাওরি বলেন, ‘‘ওরা যদি আমাদের চিকিৎসায় সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে আমরা ভগতদের কাছে ওদের যেতে বলি। আদিবাসীরা যদি ভগতদের চিকিৎসাতেও সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে আবার ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ফিরে আসে।” তিনি বলেন, এর ফলে ডাক্তারদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কোনও শত্রুতাও তৈরি হয় না। তাঁর কথায়, ‘‘চিকিৎসা ব্যবস্থা আর ডাক্তারদের প্রতি যাতে স্থানীয় মানুষের আস্থা থাকে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।”

ওয়াশালা গ্রামের বছর আটান্নর ভগত কাশীনাথ কদম বলেন, ‘‘ওরাও (ডাক্তাররা) মাঝেমধ্যেই আমাদের সাহায্য চায়, বিশেষ করে যখন ওরা কোনও কেস বুঝতে না পারে। যেমন কয়েকমাস আগেই এক মহিলা কোনও কারণ ছাড়াই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, বশে আনা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, কেউ ভর করেছে। আমি তারপর তাকে জোরে চড় মারলাম, মন্ত্র পড়ে তাকে শান্ত করলাম। তারপর ডাক্তাররা ঘুমের ওষুধ দিল তাকে।”

Left: Bhagat Kalu Jangali at his home in Pangri village in Mokhada taluka. Right: Bhagat Subhash Katkari with several of his clients on a Sunday at his home in Deharje village of Vikramgad taluka in Palghar district
PHOTO • Shraddha Ghatge
Left: Bhagat Kalu Jangali at his home in Pangri village in Mokhada taluka. Right: Bhagat Subhash Katkari with several of his clients on a Sunday at his home in Deharje village of Vikramgad taluka in Palghar district
PHOTO • Shraddha Ghatge

বাঁদিকে: মোখাদা তালুকের পাংরি গ্রামের বাড়িতে ভগত কালু জঙ্গলি। ডানদিকে: পালঘর জেলার বিক্রমগড় তালুকের দেহারজে গ্রামের বাড়িতে রবিবার সকালে আরোগ্যপ্রার্থীদের সঙ্গে ভগত সুভাষ কাতকারি 

অন্যান্য ভগতদের মতো কদম তাঁর রোগীদের কাছ থেকে দক্ষিণা চান না। তিনি তাঁর তিন একর জমিতে ধান আর ডাল চাষ করে অন্নসংস্থান করেন। আমি যে ভগতদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা বলেছেন, তাঁদের কাছে যাঁরা আসেন, সামর্থ্য অনুযায়ী যে যা পারেন দেন। কুড়ি টাকা থেকে শুরু করে কেউ কেউ নারকেল বা মদ নিয়ে আসেন। যে পরিবার আরোগ্য চাইছেন, ভগতদের সাহায্যে তাঁরা যদি আরোগ্য লাভ করেন, তাহলে ধরে নেওয়া হয় তাঁরা একদিন সকলকে খাওয়াবেন (জাগরণের মতো)

তবে আর পাঁচজন ভগতের মতো কাশীনাথও কী কী আয়ুর্বেদিক ওষধি ব্যবহার করেন, তা কাউকে বলতে চান না। তাঁর কথায়, ‘‘যদি সেটা বলে দিই, তাহলে ওষুধের জোর কমে যাবে। তাছাড়া একেক রোগীর এক এক ওষুধ। আমরা বিভিন্ন শুকনো জড়িবুটির ক্বাথ ও মিশ্রণ তৈরি করি - কিডনির স্টোন, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, জন্ডিস, মাথা ব্যথা, দাঁত ব্যথা, পেট ব্যথা, নারী বা পুরুষের বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত, গর্ভধারণে জটিলতা- এই সবকিছুর আরোগ্যের জন্য। এ ছাড়াও কাউকে প্রভাবিত করা বা কুনজর সরানো বা তাইত দিয়ে কাউকে সুরক্ষিত রাখার জন্যও ব্যবহার হয়।”

তবে মোখাদার অসারভিরা গ্রামের পাসোড়িপাড়া জনপদের ভগত কেশব মাহালে এত গোপনীয়তা নিয়ে চলেন না। তিনি বলেন, ‘‘আমর তুলসী, কাঁচা আদা, অ্যালো ভেরা, পুদিনা ব্যবহার করি, যে কোনও রোগ দূর করার জন্য। এক সময় তো আমরাই ‘ডাক্তার’ ছিলাম - যাদের থেকে জঙ্গলের সকলে পরামর্শ নিত। আজকাল চিকিৎসাবিদ্যা অনেক এগিয়ে গেছে, লোকে ডাক্তারদের বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্ত ওষুধেও যখন কাজ করে না, তখন ওরা আমাদের কাছে আসে। দুটোই এক সঙ্গে আছে, তাতে তো কোনও ক্ষতি নেই।” কেশবের দুই একর জমি আছে, তাতে ধান চাষ করেন তিনি।

Keshav and Savita Mahale (left) in Pasodipada hamlet: 'With advances in medicine, people prefer doctors. But they come to us when medicines fail them. There is no harm in co-existing'. Bhagat Kashinath Kadam (right) with his wife Jijabai in Washala village: 'The doctors often seek our help in cases which they can’t explain'
PHOTO • Shraddha Ghatge
Keshav and Savita Mahale (left) in Pasodipada hamlet: 'With advances in medicine, people prefer doctors. But they come to us when medicines fail them. There is no harm in co-existing'. Bhagat Kashinath Kadam (right) with his wife Jijabai in Washala village: 'The doctors often seek our help in cases which they can’t explain'
PHOTO • Shraddha Ghatge

পাসোড়িপাড়া জনপদের কেশব এবং সবিতা মাহালে (বাঁদিকে): ‘আজকাল চিকিৎসাবিদ্যা অনেক এগিয়ে গেছে, লোকে ডাক্তারদের বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্ত ওষুধেও যখন কাজ করে না, তখন ওরা আমাদের কাছে আসে। দুটোই এক সঙ্গে আছে, তাতে তো কোনও ক্ষতি নেই।’ ওয়াশালা গ্রামের ভগত কাশীনাথ কদম (ডানদিকে) ও তাঁর স্ত্রী: ‘ডাক্তাররাও মাঝেমধ্যেই আমাদের সাহায্য চায়, বিশেষ করে যখন ওরা কোনও কেস বুঝতে পারে না’

বিক্রমগড় তালুকের দেহারজে গ্রামের কাতকারিপাড়ার সুপরিচিত ভগত সুভাষ কাতকারি অবশ্য যে মহিলাদের গর্ভধারণে সমস্যা আছে বা জটিলতা আছে তাদের আরোগ্যের জন্য তাঁর কিছু কিছু প্রতিবিধান ‘প্রকাশ’ করেছেন। তিনি বলছেন, “গর্ভাবস্থা চলাকালীন কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলা এবং বিশেষ ধরনের খাবার খাওয়া তার মধ্যে অন্যতম। আমাদের ওষুধে কোনও মহিলা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তিনি রান্নায় তেল দিতে পারবেন না। নুন, হলুদ, মুরগি, ডিম, মাংস, রসুন আর লঙ্কা খাওয়া চলবে না। তাকে বাড়ির সব কাজ নিজের হাতে করতে হবে, এমনকি জল নিয়ে আসাও। ভগতদের ওষুধ খাওয়ার পর শেষের তিন মাস পর্যন্ত অন্য কোনও ওষুধ  খাওয়া চলবে না। আমরা সেই মহিলাকে তাইত-ও দিই, যাতে মা ও শিশু কুনজর থেকে সবসময়ে সুরক্ষিত থাকে।”

মোখাদা গ্রামীণ হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার দত্তাত্রেয় শিন্ডে বলেন, ‘‘দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এটাই, এই যে খাওয়া দাওয়া আর অন্য ব্যাপারে বিধিনিষেধ, এতে অন্তঃসত্ত্বা আদিবাসী মহিলাদের অপুষ্টি বাড়ে, ফলে সন্তানের ওজনও কম হয়। এমন ঘটনা আমি মোখাদাতে দেখেছি। এখনও কুসংস্কার রয়েছে, এবং তাঁদের ভগতদের উপর এতটাই অটল বিশ্বাস যে তাঁদের এগুলো বোঝানো কঠিন।” (বাস্তব হল, পালঘর জেলায়, যেখানে ৩৭ শতাংশ মানুষ তফশিলি জনজাতির অন্তর্গত, সেখানে অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘ দিনের। এই নিয়ে অনেক খবরও হয়েছে। অবশ্য, সে আরেক কাহিনি।)

তবে চিকনপাড়ায় নির্মলার মা, বছর চল্লিশের ইন্দুর কিন্তু বুকের ভার নেমে গেছে জাগরণের রাতেই। তিনি বলছেন, ‘‘কালু আর জয়িত্য আমার মেয়ের উপর থেকে কুনজর সরিয়ে দিয়েছে। আমি নিশ্চিত, ও তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে।”

জনস্বাস্থ্য ঘিরে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা বিভাগে, ঠাকুর ফাউন্ডেশন, ইউএসএ প্রদত্ত ২০১৯ সালের অনুদানের সহায়তায় প্রতিবেদক এই নিবন্ধটি লিখেছেন।

বাংলা অনুবাদ: রূপসা

রূপসা পেশায় সাংবাদিক। থাকেন কলকাতায়। শ্রমিক-সমস্যা, শরণার্থী সমস্যা, সাম্প্রদায়িক সমস্যা তাঁর চর্চার মূল বিষয়। ভালোবাসেন বই পড়তে, বেড়াতে।

Shraddha Ghatge

শ্রদ্ধা ঘাটগে মুম্বই নিবাসী স্বতন্ত্র সাংবাদিক এবং গবেষক।

Other stories by Shraddha Ghatge